Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সবুজ পৃথিবী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-08-12
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি...
মু কি ত  ম জু ম দা র  বা বু :  “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে চাই না আর; অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে বসে আছে ভোরের দোয়েল পাখি—চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ জাম— বট— কাঁঠালের— হিজলের— অশ্বত্থের করে আছে চুপ;...”

বাংলার অপরূপ দ্যুতিতে শুধু কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বাউল, ছড়াকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক কিংবা গীতিকারই মুগ্ধ হননি, মুগ্ধ এ দেশের ১৬ কোটি মানুষ। মুগ্ধ সারা বিশ্ব।

এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে বাংলার প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যসুধা মনের ক্ষুধা মেটায়নি এমন কোনো ভিনদেশি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কী নেই আমাদের! আমাদের আছে নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-জলাশয়, হাওর-বাঁওড় ও সাগর। সেখানে আছে শাপলা-শালুকসহ নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ। আছে বৈচিত্র্যময় মাছের প্রজাতি, যাদের জলকেলি আর নদীতে রঙ-বেরঙের পাল তোলা নৌকা, ঢেউয়ের রিনিক ঝিনিক শব্দ ভালোলাগার পরশ বুলিয়ে দেবে মনের গহিনে, অন্তরের অন্তস্তলে।

বঙ্গোপসাগরের নীল জলে সহস্র প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের আধার তাক লাগানো বিস্ময়ে সীমা অতিক্রম করে। ওপরে নীল আকাশে রঙ-বেরঙের পাখির ঝাঁক, নিচে নীল সাগরের নীল জলে ভেসে ভেসে যখন ডলফিন, কাছিম বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সাথে সখ্য গড়ে তোলে তখন মনের আকাশেও ডানা মেলে ওড়ে ভালোলাগার সোনার পাখি।

আমাদের মিষ্টি জলের হাওরগুলোও যেন যৌবনে আরেক সাগর। যত দূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। আকাশ আর জলের মিলনের মাঝে মাঝে চোখে পড়ে ভাসমান গ্রাম। এক একটি গ্রামকে মনে হয় এক একটি দ্বীপ। মাঝে মাঝে করচ ও হিজল গাছ মহিষের মতো গলা ডুবিয়ে মাথা উঁচু করে থাকে।

নতুন অতিথির কাছে বিস্তীর্ণ জলরাশির স্বচ্ছ পানির আধারকে সমুদ্র বলে ভ্রম হয়। এ সমুদ্ররূপী হাওরের ছলাত্ ছলাত্ শব্দের সাথে মাঝির কণ্ঠের সুরেলা গান, দল বেঁধে মাছের সাঁতার কাটা, লগি-বৈঠার শব্দ যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে মুগ্ধ করে। এ চিত্রের ঠিক বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে শুষ্ক মৌসুমে। হাওর পাড়ে দেখা যায় বিভিন্ন ঘাস ও নলখাগড়ার ঝোপ। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আশ্রয় ও প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই ঝোপ-ঝাড়গুলো।

মাঠের পরে মাঠ সোনালি ধানের হাসির ঝিলিক। বাথানে গরু-মহিষ-ছাগল। ছোট ছোট বিলের গর্তে মাছ ধরার ব্যস্ততা নিয়ে দেশের অপূর্ব দর্শনীয় ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ স্থান হাওর। মিষ্টি জলের ধু ধু এ সাগর সহজেই ইন্দ্রজালের মতো মোহাবিষ্ট করে ভালোলাগার মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয় আরেক ধাপ।

আমাদের আছে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এক অবর্ণনীয় বনাঞ্চল সুন্দরবন। মায়াবী এ সবুজ বনভূমি বুকের ভেতর জাগাবে অন্যরকম এক উচ্ছলতা, উদ্দামতা। ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন বিশ্বের বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এ বনে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী ও খাল।

জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম। এখানে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে আছে ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং বিশ্ব বিখ্যাত বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনের প্রধান প্রধান বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েছে— বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বন্যশূকর, বানর, লোনাপানির কুমির, অজগর, কচ্ছপ, ডলফিন, উদবিড়াল, মেছো বিড়াল, বন বিড়াল ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের টাইগার পয়েন্টখ্যাত কটকা ও কচিখালী অভয়ারণ্য, মংলা বন্দরের অদূরে করমজল বন্যপ্রাণী ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র, হারবাড়িয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র এবং পশ্চিম বিভাগের হিরণপয়েন্টখ্যাত নীলকমল অভয়ারণ্য, শেখেরটেক প্রাচীন মন্দির, সাতক্ষীরা-বুড়িগোয়ালিনীর কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র, মান্দারবাড়িয়া অভয়ারণ্যসহ প্রকৃতির অপরূপ সব দৃশ্য মন ছুঁয়ে যায়। টাইগার পয়েন্ট, হিরণপয়েন্ট বা বুড়িগোয়ালিনী, হারবাড়িয়ায় বাঘ মামার দেখা মিললে তো কথাই নেই। খাল আর নদী সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। নৌকায় করে সুন্দরবনে ঘুরলে চোখে পড়ে জীববৈচিত্র্যের এক সুবিশাল ভাণ্ডার। প্রকৃতির ছায়ায় প্রকৃতির মায়ায় গড়া এ বন আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব।

১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবন রামসার স্থান এবং ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কো কমিশন বনটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। আর সুন্দরবন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় সুন্দরবন দিবস।

আমাদের আরেক অহংকার দেশের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্বীপগুলো। সেন্টমার্টিন, নিঝুমদ্বীপ, হাতিয়া, ভোলা, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সোনাদিয়া, দক্ষিণ তালপট্টি, দমার চর, চর শাহজালাল, শাহপরীর দ্বীপ, চর পিয়াল, নলচিরা, সুখচর, বয়রার চর, চর নিজাম, চর মনিকা, মনপুরা, ঢাল চর, চর কুকরী মুকরী, চর পাতিলা, চর লক্ষ্মী, নীলকমল, চর নিউটন ইত্যাদি চর অলংকার হয়ে দেশের কলেবরকে করে তুলেছে সৌন্দর্যের লীলাভূমি। সেন্টমার্টিনের কথাই ধরা যাক— সারি বাঁধা নারিকেল গাছ, সাগরের ঢেউয়ের তালে তালে তীরে বাঁধা নৌকার ওঠানামা, পানির নিচের জীবন্ত প্রবাল, বৈচিত্র্যময় মাছের ছোটাছুটি, মহাসাগরের কোল থেকে ছুটে আসা বন্ধনহীন বাতাসের উল্লাস... সব মিলে দ্বীপটিকে স্বপ্নপুরী বললে ভুল হয় না।

ছোট্ট এই দ্বীপটির আয়তন মাত্র ১২ বর্গ কিলোমিটার। মূলদ্বীপ ছাড়াও রয়েছে কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত একটি বর্ধিতাংশ যেটি ছেঁড়াদ্বীপ নামে পরিচিত। মৃত প্রবালের কাঠামোর ওপর স্থাপিত এই দ্বীপের পুরোটাই সমতল। বিস্তীর্ণ সৈকতজুড়ে রয়েছে প্রবালের কঙ্কাল। দ্বীপ ও দ্বীপসংলগ্ন সমুদ্র মিলিয়ে রয়েছে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পানির ওপর থেকেই দেখা যায় প্রবালের বর্ণিল জগত।

সেখানে ছোট-বড়, মেরুদণ্ডী-অমেরুদণ্ডী অধিকাংশ প্রাণী ও উদ্ভিদকে আগলে রেখেছে প্রবাল। সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল রয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা এই প্রবালপ্রাচীরগুলো সাগরে মাছের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত। প্রবাল প্রাচীরের গা বেয়ে বেড়ে উঠেছে নানা প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল। রঙিন এই শৈবালের কোনোটি সবুজ, কোনোটি বেগুনি আবার কোনোটি লাল।

প্রবালের ফাঁকে ফাঁকে খাদ্য ও আশ্রয়ের সন্ধানে ব্যস্ত সাগরের বিভিন্ন প্রাণী। এদের কোনোটি দেখতে ফুলের মতো আবার কোনোটি দেখতে শাখা-প্রশাখাযুক্ত গাছের মতো। সব মিলে সেন্টমার্টিন স্বপ্নের বিচরণ ভূমি, স্বপ্নপুরী।

দ্বীপের ভেতর নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের আরেক বিস্ময়। বঙ্গোপসাগরের কোলে সৈকত ও চরবেষ্টিত দৃষ্টিনন্দন সবুজের স্বর্গরাজ্য এই দ্বীপ। মূলত বল্লারচর, কমলার চর, চর ওসমান ও চর মুরি—এ চারটি চর মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ; যার আয়তন প্রায় ১৪,০৫০ একর।

বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ নীল জলরাশিতে একখণ্ড উজ্জ্বল সবুজের মনোহর স্থানকে ২০০১ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। উদ্ভিদ, প্রাণী আর মানুষের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের ফসল হলো নিঝুম দ্বীপ। দ্বীপটিতে রয়েছে বাইন, গেওয়া, কেওড়া ও কাঁকড়া গাছের সুবিশাল সারি। খোলা মাঠ যেন সবুজের গালিচা।

দ্বীপের শরীরে শিরা-উপশিরার মতো স্বচ্ছ জলের সরু খাল। ঝাঁকবাঁধা মাছেরা প্রতিযোগিতা করে কে কার আগে যেতে পারে। এক পা এক পা করে নদীর কিনারে খাবারের খোঁজে এদিকে-সেদিক ঘুরে গাঙচিল। কাদা-জলে উল্লাস করে নানা জাতের হাঁস। ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নেয় দেশি বক। পানকৌড়ি আর কাদাখোঁচা পাখির ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। আকাশের নীলে ডানা মেলে উড়ে কালা ও খয়রামাথা গাঙচিল।

গাছের উঁচু মাথায় বসে থাকে ধলাপেট ও মেটেমাথা সিন্ধু ঈগল। খোলা মাঠে ইচ্ছেমতো ছোটাছুটি করে চিত্রা হরিণের দল। কেউ ঘাস খায়। কেউবা দুষ্টুমি করে একে অন্যের সাথে। আবার কেউবা জল খেতে নামে খালের কিনারে। মায়াবী হরিণের মায়ার টান অভাবনীয় এক মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয় দ্বীপটিতে ভ্রমণরত মানুষের মনে-প্রাণে। প্রকৃতি যে মানুষকে এতটা বিমোহিত করতে পারে তার বড় প্রমাণ নিঝুম দ্বীপ।

এছাড়া দেশের কোনো কোনো দ্বীপে দেখা যায় শুধু পাখি আর পাখি। মনে হয় এটা যেন পাখিদের রাজ্য। যেমন দমার চর। বৈচিত্র্যে ভরপুর এক দৃষ্টিনন্দন দ্বীপ। কোথাও কোনো মানুষজন নেই। যেদিকে তাকানো যায় শুধু পাখি আর পাখি। জিরিয়া, বাটান, গুলিন্দা, বক, চখাচখি, গাঙচিল, পানচিল, উল্টোঠুঁটি, কালালেজ জৌরালি, টি টি, কাস্তেচরাসহ প্রায় ৪০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। বিচিত্র এদের রং। বিচিত্র এদের অঙ্গভঙ্গি। বিচিত্র চলন-বলন।

কোনোটা কালো, কোনোটা সাদা, কোনোটা আবার হলুদ। কোনোটা আবার ছাইরঙা। নানা ভঙ্গিমায় স্বাধীনভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছে চরের মাটিতে। একেক ধরনের আওয়াজ করে ডাকছে একেক প্রজাতির পাখি। যেন পাখির মেলা বসেছে। এখানে পাখি, ওখানে পাখি। সবখানেই পাখির দল! দমার চরে নেই কোনো শিকারির ভয়। নেই কোনো বিষটোপের ভয়। এরা এখানে নির্ভয়, নিরাপদ। এই চরে দেখা মেলে বিপন্নপ্রায় গাঙচষা। পৃথিবীতে এই পাখির সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। এর মধ্যে আমাদের দেশেই রয়েছে এক হাজার থেকে বারোশ’ গাঙচষা।

আমাদের রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। কক্সবাজার নাজিরার টেক থেকে শুরু করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত এ সৈকত। সুদীর্ঘ সোনালি বালুচর, দুর্লভ ঝিনুক, সুউচ্চ ঢেউ, নীল জল আকাশের এক রেখায় মিলন, রাতের নিস্তব্ধতা, লাল রঙের কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ, গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে জেলেদের ফিরে আসা, সামুদ্রিক অলিভ রিডলি কাছিমের ডিম পাড়তে আসা, অবাধ সাঁতার, গোসল, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, সৈকতের পাদদেশেই বিশাল ঝাউবাগান... সব মিলিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কোনো উপমা হয় না পৃথিবীর অন্য কোনো সৈকতের সঙ্গে।

‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’—নজরুলের গানের মতো আমাদেরও আছে সবুজ ঢেউ খেলানো পাহাড়। আছে ঝর্ণা, গাছ-গাছালি, নানা প্রজাতির রংবাহারি পাখ-পাখালি, ছড়া, নদী, দুর্গম পথ। পথের দুধারে চোখ জুড়ানো সবুজ পাহাড়ের গায়ে সাজানো গোছানো ছোট ছোট ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসতি। আছে তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা ও উত্সব অনুষ্ঠান। পাহাড়গুলোকে সমৃদ্ধ করেছে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্য।

আমাদের আরও রয়েছে রাতারগুলের স্বাদুপানির জলাবন। পৃথিবীর ২২টি স্বাদুপানির জলাবনের মধ্যে সিলেটের রাতারগুল একটি। বনের মোট আয়তন ৩,৩২৫ একর। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সংরক্ষিত সমৃদ্ধ জলার বন হিসেবে ঘোষণা করে বন বিভাগ। বর্ষা মৌসুমেই রূপ-মাধুর্যে বনটি হয়ে ওঠে অনন্যা। ফিরে পায় অষ্টাদশী তরুণীর যৌবন। থৈ থৈ পানির সাগরে মানুষের অবাক বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা একখণ্ড সবুজ বন। ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় শুষ্ক মৌসুমে। পানি শুকিয়ে গেলেও বনের কিছু কিছু জায়গায় পানি থাকে। সেখানেই জড়াজড়ি করে বেঁচে থাকে জলজপ্রাণী।

জলের বন বলে সাপের সংখ্যাই বেশি। এছাড়া রয়েছে বেজি, বানর, গুইসাপ। পাখির মধ্যে আছে— সাদা বক, কানি বক, মাছরাঙা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঘুঘু, চিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। শীতকালে চারপাশ মুখরিত করে রাখে স্থানীয় পাখিদের সাথে পরিযায়ী পাখির দল। মাছের মধ্যে আছে আইড়, রুই, রিঠা, টেংরা, খলিশা, পাবদা, কালবাউশসহ বিভিন্ন জাত। রয়েছে শীতলপাটি বানানোর প্রধান উপকরণ মূর্তা গাছ।

বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গ্রামই এক একটি পর্যটন কেন্দ্র। শহর ছেড়ে একটু দূরে গেলেই দেখা মেলে এসব গ্রামের। সবুজের পর সবুজ মাঠ। তারই মাঝে মাঝে ছন, টিন, গোলপাত, টালির ছোট ছোট ঘর। আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, রাখালের সুমধুর বাঁশির সুর, কৃষকের গান, গরুর হাম্বা হাম্বা ডাক, পাখির কিচিরমিচির শব্দ, গাছের শীতল ছায়া, বহতা নদী, পুকুর, মানুষের সহজ-সরল জীবনের সঙ্গে অলস সময়ের গ্রাম পৃথিবীর সব গ্রামের চেয়ে সেরা। আমাদের দেশে সব আছে। কানায় কানায় ভরা নদীর মতো।

সবকিছু থাকার পরও আমাদের নেই সচেতনতা। আমরা পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছি, বসতি গড়ছি, গাছ ও মাটি কেটে সবুজ পাহাড়কে করে তুলছি বিবর্ণ। আমরা নদী দূষণ করছি, শাসন করছি, ভরাট ও দখল করছি ছোট-বড় জলাশয়। আমরা হাওরের পানি সেচে এমনভাবে মাছ আহরণ করছি যাতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের জলজ জীববৈচিত্র্য। বনসুন্দরী সুন্দরবন থেকে গাছ, মাছ, মধু ইত্যাদি মাত্রাতিরিক্ত আহরণ করছি যার কারণে সুন্দরবন দিন দিন হারিয়ে ফেলছে রূপলাবণ্য।

আমরা যত্রতত্র আইন অমান্য করে গড়ে তুলছি ইটভাটা, কার্বন নিঃসরণকারী কারখানা। দ্বীপগুলোর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছি যার কারণে সৌন্দর্যের এই আধারগুলোয় অমানিশার কালো ছায়া নেমে আসছে। বঙ্গোপসাগরের নীল জল নানাভাবে বিষাক্ত করে জলজ জীববৈচিত্র্য বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছি।

আরও নানাবিধ মানবসৃষ্ট কারণের সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রকৃতির রুদ্র রোষ। আইলা, সিডরের মাধ্যমে প্রকৃতিকে প্রতিশোধ নিতে দেখেছি। আগামী দিনগুলোতে এই প্রতিশোধের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেশি হয়ে ফিরে আসবে যদি আমরা এখনই সচেতন না হই। তাই বর্তমান সময়ের দাবিতে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সচেতনতা। এই সচেতনতাই দিতে পারে সুন্দর প্রকৃতিতে সুস্থ জীবন।

(একে/আগস্ট ১২, ২০১৪)