Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সবুজ পৃথিবী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-08-19
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকি বাড়ছে রোগবালাইয়ের
তোফাজ্জল হোসেন : মেঘনার তীর ঘেঁষা গ্রাম সাত ভাইয়াপাড়া। নদীর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে এ গ্রামের মাটিতে। জাহাজের নোঙর ফেলার শব্দ। লঞ্চ-স্টিমারের হর্নের শব্দ সবই কর্ণগোচর হয় গ্রামের বাসিন্দাদের। তথাপি এ গ্রামেরই ভিতর পানি প্রবাহিত ও নিষ্কাশনের অভাবে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। ব্যাপারটা সত্যিই অবাক হওয়ার মতো।

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় বৈদ্যের বাজারের এ গ্রামটিতে হাজারো পরিবারের বসতি। এখানে স্কুল, বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা আছে সবই। তাই প্রতিদিন অগণিত লোকের চলাচল এ গ্রামের ওপর দিয়ে। একদা মেঘনার বিধ্বংসী রূপ বৈদ্যের বাজারের বিরাট অংশ বিলীন করে দিলেও বর্তমানে সে রূপ আর নেই।

গ্রামের ভিতর দিয়ে পাকা রাস্তা। বাজারের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে এসে সে রাস্তা বেরিয়ে গেছে অন্য গ্রামে। মিলেছে গ্রামের পশ্চিমের বড় রাস্তার সাথেও। এ রাস্তায় পথ চলতে দেখা যায় অনেকগুলো পুকুর। রাস্তার পাশে কখনও একটি কখনও দু’পাশে দুটো পুকুরও রয়েছে। সেসব পুকুরের পানি মোটেও ভালো নয়। নোংরা ও অস্বচ্ছ। কোনোটি কচুরিপানায় ঠাসা পচা গন্ধ। পুকুরগুলোতে নির্দিষ্ট স্থানে পাইপ ও পানি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও তা মূল্যহীন। কারণ আশপাশে এখন আর বর্ষার পানির দেখা মেলে না।

বৃষ্টিই ভরসা। বৃষ্টির দিনে পুকুর ও ভরাট থাকে। তাও আবার ফাল্গুন-চৈত্র মাস আসতে আসতে সে পানির দিকে তাকানো যায় না। বর্ষার পানি প্রবাহিত না হওয়াতে সারা বছর লতাপাতা পচে এখানে পানি দূষিত হচ্ছে। প্রতিটি বাড়ির ময়লা আবর্জনা উচ্ছিষ্ট ফেলা হচ্ছে বাড়ির নিকটস্থ পুকুর, পরিত্যক্ত জায়গা কিংবা রাস্তার পাশে। এমনকি সেপটিক ট্যাঙ্কের ময়লাও। এসব ময়লা আবর্জনায় নষ্ট হচ্ছে চারপাশ, বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। উপদ্রব বাড়ছে পোকামাকড় ও জীবাণুবাহিত মশার। ঝুঁকি বাড়ছে রোগবালাই ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের।
 
শুধু তাই নয়, নিচু ফসলি জমি পরিণত হয়েছে আবদ্ধ জলাভূমিতে। চারপাশে অপরিকল্পিত ও যত্রতত্র বালু ভরাটের কারণে নদীর সাথে সংযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া গ্রামের ভিতরে যে নালাটি ছিল সে নালাটি ভরাট হওয়াতে প্রধান সমস্যাটি হয়েছে। একদিকে বর্ষা না আসতেই বৃষ্টির পানি ফসলি জমিকে তলিয়ে দেয়। অন্যদিকে বর্ষা চলে গেলেও ডুবে যাওয়া ফসলি জমির বৃষ্টির পানি সরতে পারে না। বর্ষা কখন আসে কখন যায় এ গ্রামের ফসলি জমির একটা অংশে তার প্রভাব পড়ে না। নদীর এত নিকটে থেকেও এ বৈরী অবস্থা ও বিপন্ন পরিবেশ অবাক করে বৈকি।
 
গ্রামের পূর্বপাশে নদী উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত। পশ্চিম পাশে বড় রাস্তা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে বারদীর দিকে গেছে সে রাস্তাটিও উত্তর-দক্ষিণ ঠিক নদীর সমান্তরাল। দক্ষিণে হাইওয়ে থেকে আসাা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডটি গ্রামের পাশ দিয়ে নদীর তীরে ঠেকেছে।

উত্তরে পার্শ্ববর্তী গ্রামে বড় রাস্তা থেকে একটি শাখা রাস্তা ঢুকেছে। সেটাও সোজা পূর্ব দিকে নদীর কাছে এসে শেষ হয়েছে। মাঝখানে এ গ্রামটি। উত্তরের ওই বড় রাস্তা থেকে শাখা রাস্তার সংযোগ স্থলে একটি পুল ছিল। উভয় পাশে ভরাটের কারণে সে পুলের অস্তিত্ব আর নেই। বড় রাস্তায় দুপাশের পানি চলাচলের জন্য দুটি কালভার্ট ছিল। নির্ধারিত দূরত্বে ও উপরোক্ত স্থানে। তাও বালুভরাটে বন্ধ হয়ে রাস্তার দু’পাশেই পানিপথ বিনষ্ট হয়ে জমিগুলো আবদ্ধ হয়ে গেছে। একদা নদী ভাঙনে বিশাল জনগোষ্ঠী ভূমিহীন হয়ে পড়েছিল।

তাদের কিছু অংশ এসে এ গ্রামে ঠাঁই নিয়েছিল। গ্রামের পূর্ব দিকে গুচ্ছগ্রাম নামে গণবসতি গড়ে তোলে। এতে করে গ্রামের পূর্ব পাশটা কিছু বাধাগ্রস্ত ও তার সাথে যোগ হয় মেঠোপথ, বিভিন্ন বাড়ির সংযোগ পথ, নিচু জমি ভরাট করে বসতি বাড়ানো এবং সর্বোপরি যথাস্থানে কালভার্টের ব্যবস্থা না রাখা। ইত্যাদি কারণে নদী থাকলেও জমিগুলো আবদ্ধ হয়ে আছে এ গ্রামে। বসতবাড়ি আর বিভিন্ন স্থাপনায় হারিয়ে গেছে গ্রামের একমাত্র নালাটি।

এলাকার পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার বড় কারণ ওই নালাটি বেদখল হয়ে যাওয়া। যতদিন নালাটি ছিল ততদিন বর্ষার পানিতে টইটম্বুর থাকত এ গ্রাম। বর্ষা কবলিত তখনকার পরিবেশ ছিল আনন্দঘন। বর্ণনা করলে এ রকম দাঁড়ায়—চারদিকে অথৈই পানির হাতছানি, ছেলে-মেয়েদের ডুব সাঁতার, উঁচুস্থান থেকে লাফানো, দল বেঁধে শাপলা-শালুক কুড়ানো। খাল-বিলে দিনের বেলা কনুই জাল আর রাতে টর্চ লাইটের আলোতে নৌকায় চড়ে মত্স্য শিকার এ ছিল তখন এ গ্রামের দৃশ্যপট। এ রকম স্মৃতি রোমান্থিত হলে ছেলেবেলার কথা মনে পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। ভাবনার বিষয় হলো গ্রামে জন্মে গ্রামে বেড়ে উঠলেও এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা হয়তো সে স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবে।

বাস্তবতা হলো এখন কারও বাড়িতে বৃষ্টির পানি জমলেও সে পানি নিষ্কাশনের পথ নেই। তার ওপর যদি পুকুরগুলো ভরাট হয়ে যায়, তবে ময়লা আবর্জনা ও ধোয়া-মোছার পানি ফেলবার জায়গাও থাকবে না। অতিবর্ষণে এখনই পুকুর বা ডোবার পানি উপচে পড়ে কারো কারো বাড়িতে। তলিয়ে যায় উঠোন-আঙ্গিনা, গড়িয়ে বেড়ায় জীবাণুবাহিত পানি।

স্থায়ী হয় অনির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত। অস্বস্তিতে থাকেন ভুক্তভোগী। দূষিত এসব পানির উপদ্রব বন্যার পানির চেয়েও ভয়াবহ। বর্ষা বা বন্যায় জোয়ার ভাটার পানিতে আমরা পরিশোধিত হতে পারি। কিন্তু আবদ্ধ নরদমার পানি কতটা ভয়ানক তা সহজেই অনুমেয়।
 
মেঘনা নদীর কূল-ঘেঁষা একটি গ্রামে যদি এ হাল তাহলে আমাদের পরিবেশ কতটা হুমকির মুখে সেটা বিবেচনায় এনে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে অনতিবিলম্বে সোচ্চার হতে হবে পরিবেশ রক্ষার্থে।

(একে/আগস্ট ১৯, ২০১৪)