Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সবুজ পৃথিবী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-08-19
সুন্দরবনের সৌন্দর্য রক্ষায়
এম এ সাইদ খোকন : বাংলাদেশ নদীমাতৃক, সুন্দরবন তার চেয়েও বেশি। কোথাও ক্ষীণতন্বী নদীস্রোত যত দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে, ততই বিস্তৃত, ততই প্রশান্ত, ততই তরঙ্গবিক্ষুব্ধ ক্ষিপ্রগতি হয়ে উঠছে। যেতে যেতে প্রতিটি নদীর কত শাখা-প্রশাখা, খাল-নালা সৃষ্টি করেছে তার সুমার সহজে করা যায় না। বাংলাদেশে যত নদী-খাল আছে সুন্দরবনে বোধ করি তত আছে।

তার ওপর নদী-নালার পাশে ঝোপ-ঝাড়, কেওড়া-হিন্তাল, সুন্দরী-গরান-গেউয়া প্রভৃতি গাছ। গভীর অরণ্য তীরে তীরে ঝুঁকে পড়ে সৃষ্টি করেছে অন্ধকার। কোথাও খালগুলোর দু’পাশে গোলগাছের ঠাসাঠাসি সুড়ঙ্গ পথের প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই বন্যসৌন্দর্য একমাত্র সুন্দরবনের জন্য সংরক্ষিত। সেই বন্যসৌন্দর্য না দেখলে কল্পনা করা কঠিন। সেই শোভা দেখতে দেখতে কোনো ত্রিমোহনা বা বাঁকের মুখে পৌঁছে দেখা যায় আরেক অপূর্ব দৃশ্য।

দু’পাশে বিস্তৃত চড়া, চড়ার ওপর সবুজ কেওড়া গাছের সুশ্রেণি, তার আড়ালে ঢেকে গেছে বন। এর মধ্যে বনের জীবজন্তু ও পাখিদের কথা বলাই হলো না। সামনে শুয়ে আছে জীবন্ত সুন্দর অকূল জলরাশি। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ অথবা ধূমাকারে বাষ্প খেলা করছে, অথবা জলীয়বাষ্প উঠতে উঠতে বৃষ্টি ছুটে আসছে, অথবা গাছের ডাল ছুঁয়ে ছুটে যাচ্ছে বাষ্পমেঘ, তারপর সুন্দরবনের ছোঁয়া পেয়ে বৃষ্টির ধারাপাত খুলে বসেছে। এই সৌন্দর্যের সম্মোহন সহজে ছিন্ন করা সম্ভব নয়। এই সৌন্দর্য একান্তই সুন্দরবনীয়।

সুন্দরবন এক জাদুমাখা নাম। কোনো আদিকালে গঙ্গা ও পদ্মার মোহনায় পৃথিবীর বৃহত্তম এই বদ্বীপ গড়ে উঠেছিল আর দ্বীপগুলোতে সৃষ্টি হয়েছিল গভীর অরণ্য তা লেখাজোখা নেই। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কাদামাটির ওপর বুকের পাঁজরের মতো শেকড় বেরিয়ে থাকা ম্যানগ্রোভ বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃক্ষরাজি। নিবিড় লতা গুল্ম-ঘাসের জঙ্গল। আর সবুজের ওপর ফুটে আছে বিচিত্রবর্ণের ফুল আর ফুল। তার ওপর উড়ছে-বসছে মৌমাছি, অরণ্যের ভয়ঙ্কর বাঘ, দাঁতাল শুকর, বিষধর সাপ। নদীর হাঙর, কুমির, কামট এবং হরিণ-বানর। সিন্ধু ঈগল থেকে ছোট্ট মাছরাঙ্গার মতো অনেক রকম স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখি। নদী-খালে আরও আছে ভোঁদর, ডলফিন, মাছ, কচ্ছপ, কাঁকড়া। আষাঢ়-শ্রাবণে শোনা যায় বঙ্গোপসাগর থেকে আসা বরিশাল কামানের গর্জন। একে আবার দৈব শব্দ বা গায়েবি আওয়াজও বলে। ইংরেজরা বলত, ‘বরিশাল গান্স’। আমি এর শব্দ গাম্ভীর্য ও শব্দ বৈভব উপভোগ করছি বহুবার।

অনেক পণ্ডিতের মতে, প্রাচীন ভারতবর্ষে তেরোটি মহাবন ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম ছিল আঙ্গেরিয় বন। এর বিস্তৃতি ছিল বঙ্গোপসাগরের উপকূল থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত। তারই আজকের অংশ আমাদের একমাত্র অরণ্য সুন্দরবন। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা ও সিলেটের অরণ্য এখন শুধু নামেই বেঁচে আছে। আবার প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে জানা যায় গঙ্গা নদীর তীরের লক্ষেৗ শহরের কাছে সুন্দরবনীয় বৃক্ষের নমুনা পাওয়া গেছে। অর্থাত্ এক সময় সুন্দরবন সেখানে ছিল। গঙ্গা সেখান থেকে এক সময় আরও উত্তর দিকে প্রবাহিত হতো।

সেই সুন্দরবন এক শো বছর আগেও ছিল মেঘনা মোহনার পশ্চিম থেকে হুগলী নদীর পূর্ব দিক পর্যন্ত। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১৬০ মাইল। উত্তর-দক্ষিণে প্রস্থ ছিল পশ্চিম দিকে ৭০ মাইল থেকে পূর্ব দিকে ৩০ মাইলের বেশি নয়। গড়ে বিস্তৃতি ৬০ মাইল হলে সুন্দরবনের আকার ৯০০০ বর্গমাইল। এখন বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনার দক্ষিণে সুন্দরবন নেই। হরিণঘাটা নদী এখন সুন্দরবনের পূর্ব-সীমা। এখন বাংলাদেশ ও ভারত মিলে সুন্দরবনের আয়তন ধরা হয় ১০ হাজার বর্গ কি.মি.। তার মধ্যে বাংলাদেশে ছয় হাজার বর্গ কি.মি. আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চার হাজার বর্গ কি.মি.। আজ থেকে ১২০-২৫ বছর আগে সুন্দরবন ছিল যথার্থ অর্থে অরণ্য। এখন অরণ্যের কঙ্কাল, গলিত লাশ। সেই সময় ইংরেজদের নজরে আসে সুন্দরবন।

ইংরেজরা বুঝতে পারে এই অরণ্যবহুল দ্বীপের ঘন গাছপালা কেটে সাফ করতে পারলে চাষের জমি বাড়বে, ভূমি রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে। এই লোভে তারা সুন্দরবনের দ্বীপগুলো ইজারা দিতে শুরু করে। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের ধনীরাও এসে ইজারা নিতে থাকায় লোভের থাবা পড়ে অরণ্যে। ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের ফলে এই কাণ্ড ঘটেছিল। বিশ্বপ্রকৃতি বা পরিবেশের ওপর মানবের মারাত্মক আঘাত বা আধিপত্য বিস্তারের অশুভ পদক্ষেপ পড়তে শুরু করে। মানুষ তখন এর ভয়াবহ পরিণামের মাত্রা বুঝতে পারেনি।

সুন্দরবনের অরণ্যে হিংস্র পশু ও পানির প্রাণির সঙ্গে অসুরিক লড়াই চালিয়ে জঙ্গল সাফ করে ফসল উত্পাদন শুরু করে মানুষ। মানুষের সেই ঢেউয়ে আজ বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনার অরণ্য লুপ্ত। ১৬ কোটি মানুষের চাপে কোথায় গিয়ে থামে কে জানে। যদি সুন্দরবন অত্যাচারে অত্যাচারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তার অচিন্তনীয় কুফল বইতে হবে ১৬ কোটি মানুষ এবং তার বংশধরদের। সেই সঙ্গে বিশ্ববাসীদেরও।

সুন্দরবনের মূল্য টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সুন্দরবন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে প্রথম বিপর্যয় দেখা দেবে আবহাওয়ায়, বৃষ্টিপাতে। দ্বিতীয় বিপর্যয় আইলা বা এরকম সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণবঙ্গ তছনছ হয়ে যাবে।

জীববৈচিত্র্যে চরম সঙ্কট সৃষ্টি হবে। তার মধ্যে পাখি, জীবজন্তু, মত্স্যসম্পদ থেকে কীটপতঙ্গ কিছুই বাদ পড়বে না। অর্থাত্ সুন্দরবনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব সম্পদ তার সঙ্গে অচ্ছেদ্য সম্পর্কে আবদ্ধ। বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রকৃতি, পরিবেশ, বনজসম্পদ আর অরণ্যচারী প্রাণিদের নানা তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। এখন সেগুলোই আমাদের ও সরকারের সম্বল। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমাদের জ্ঞান, রাষ্ট্রের কাজকর্ম। পরিকল্পক বিশেষজ্ঞরা হয়তো ভাবতেই ভুলে যান সে প্রায় একশত বছরে সুন্দরবনের কত পরিববর্তন হয়ে গেছে। জলবায়ুরও বদল হয়েছে। গঙ্গা-পদ্মার নাব্য কমে গেছে। তার ওপর সুন্দরবনের ওপর পড়েছে জনসংখ্যার চাপ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর লোলুপ দৃষ্টি, রাজনৈতিক খেলা ও বহির্দেশের কলকাঠি নাড়া। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ডলফিন বা শুশুক, ঘড়িয়াল, কুমির, কচ্ছপ, কাঁকড়া লুপ্ত হয়ে গেলে অন্যদের কিছুই আসে যায় না। আমাদের আসে-যায়। এমনকি সুন্দরবন আমাদের গৌরব, সম্মান এবং অহংকারও। আমাদের ভবিষ্যত্ বংশধরের জন্য রেখে যেতে পারার মতো প্রাকৃতিক অরণ্য, তরল সোনা তেল-গ্যাসের ভাণ্ডার। এজন্যও সুন্দরবনের ওপর আমার এত নজর, বিদেশিদের নজর কেন তা তো জানেনই।

সবার আগে দরকার সুন্দরবনের সমীক্ষা। দ্বীপ-বদ্বীপ ঘিরে থাকা নদী-খালের সঠিক মানচিত্র। অরণ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ, বন্যপ্রাণী ও অরণ্যের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের প্রকৃত তথ্য। তার ওপর ভিত্তি করেই তো উন্নতি বা উন্নয়ন পরিকল্পনা। প্রান্তিক মানুষ, দরিদ্র মানুষকে অবহেলা করে কোনো কিছুতেই তিলোত্তমা করা যায় না। সম্পন্ন মানুষ সব সময় এদের পরোক্ষে বর্জন করে চলে। সুন্দরবনের সম্পদ লুট ও ভাগাভাগি করে ক্ষমতাধর বনকর্তা ও রাজনৈতিক শক্তির ছত্রছায়ায় নিয়োজিত পঙ্গপালেরা।

বনসম্পদ বলতে এখন সুন্দরবনকেই বুঝি। আমাদের একমাত্র স্বপ্ন-অরণ্যকে রক্ষা করতে পারি না?  
সুন্দরবন ধ্বংসের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও দায়ী। কিন্তু প্রকৃতির ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, সিডর আইলাতে ধ্বংস হওয়া সুন্দরবনের ক্ষতি প্রকৃতির নিয়মে আবার পূরণ হয়। কিন্তু আজকের যুগের মানুষের অত্যাচার, কলকারখানা স্থাপন, মাটির নিচের খনিজ সম্পদ আহরণের অত্যাচার পূরণ হওয়ার নয়।

সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে সর্বাগ্রে দরকার পুঙ্খানুপুঙ্খ জরিপ। এতে পাওয়া যাবে তার সঠিক পরিস্থিতি। সেই পরিস্থিতি অনুযায়ী তাকে রক্ষা করার কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণীত হওয়া সম্ভব ও উচিত। সুন্দরবনে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অনেক ডুবোচর জন্ম নিচ্ছে। নদী-খাল নালা পলিতে ভরে গেছে। সাগরের মত্স্য সম্পদ এসব কারণে দিগভ্রান্ত হয়ে সরে যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইলিশ তাদের স্বাভাবিক বিচরণ ক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাচ্ছে নতুন জায়গায়।

সুন্দরবন নিঠুর নিদয়া হয়ে যাবে মানুষের অত্যাচারে। প্রকৃতিক অত্যাচার প্রকৃতির অংশভাগী সুন্দরবন হজম করতে জানে। মানুষের অত্যাচার থেকে বাঁচার কৌশল তার জানা নেই। এই সত্য অমোচনীয়।

(একে/আগস্ট ১৯, ২০১৪)