Space For Rent

Space For Rent
রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৪
প্রচ্ছদ » রাজধানী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-08-24
বাক্সভর্তি ইউরেনিয়াম!
বর্তমান প্রতিবেদক : ‘রাতারাতি কোটিপতি হতেই ইউরেনিয়াম আনা হয় সুদূর রাশিয়া থেকে। আর এজন্য গার্মেন্টস ব্যবসার সম্পূর্ণ টাকা বিনিয়োগ করা হয় ইউরেনিয়ামের পিছনে। প্রায় ৫০ কোটি টাকার ইউরেনিয়াম (আসল ইউরেনিয়াম হলে) কেনা হয় মাত্র ১২ লাখ টাকায়।’ গোয়েন্দাদের হাতে আটক ১১ জনকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ধারণা, বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে ইউরেনিয়াম আমদানি ও এর ব্যবহারের কোনো অনুমোদন না থাকা এই পদার্থ ‘গোপনে’ বিক্রির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতানোর উদ্দেশ্যে ক্রেতা খুঁজছিল গ্রেপ্তারকৃতরা। এরই মধ্যে কয়েকজন ক্রেতাকে ‘টাকার বিনিময়ে’ ইউরেনিয়াম দেখিয়েছেও এই চক্র। তবে দরদামে বনিবনা না হওয়ায় বিক্রি হয়নি। আর এগুলো দিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আকৃষ্টের মাধ্যমে একপ্রকার ব্যবসায় নেমেছিল গ্রেপ্তারকৃতরা।
এদিকে ইউরেনিয়াম বেচাকেনার নামে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার ১১ জনকে চারদিন করে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম আনোয়ার সাদাত রবিবার এ আদেশ দেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত শনিবার অভিযান চালিয়ে অতি মূল্যবান রাসায়নিক পদার্থ ইউরেনিয়ামসদৃশ পদার্থ উদ্ধার করা হয়। এ সময় ১১ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তারা হলেন— মো. ময়নাল হোসেন সাগর (৪৫), মো. হুমায়ুন কবির (৪৮), মো. কাইয়ুম চৌধুরী (৫৪), মো. কায়েশ আহম্মেদ (৫৪), মো. খালেক (৪৪), মো. স্বপন মোল্লা (৪৫), মো. ফিরোজ (৪৫), মো. মাহফুজুর রহমান নাসিম (৪২), মো. আসলাম মিয়া (৬১), মইনুদ্দিন সরোয়ার রাজন (৩৫) ও মো. তোফায়েল আহম্মদ পাটোয়ারী (৪৮)।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। এ সময় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) উপকমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে একটি চামড়ার বাক্স জব্দ করা হয়। এ বাক্সের মধ্যে ইউরেনিয়ামসদৃশ দুই পাউন্ড পদার্থ পাওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া এ পদার্থগুলো ইউরেনিয়াম বলে দাবি করছে গ্রেপ্তারকৃতরা, যার আনুমানিক মূল্য অন্তত ৫০ কোটি টাকা।
কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘এগুলো আসলেই সেই অতি মূল্যবান ইউরেনিয়াম কি না তা নিশ্চিত হতে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হবে।’ বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে এ ইউরেনিয়াম বেচাকেনা ও ব্যবহারের বৈধতা নেই। সরকারি কিছু গবেষণাগারে এ ইউরেনিয়াম ব্যবহূত হয়।
তিনি বলেন, ‘বিদেশি আমদানিনিষিদ্ধ বস্তু বিক্রির কথা বলে এরা প্রতারণা করে আসছিল। আটকরা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের টার্গেট করে ইউরেনিয়ামের আন্তর্জাতিক চাহিদা সম্পর্কে তাদের অবহিত করত। তাদের লাখ টাকা বিনিয়োগ করে কোটি টাকা আয়ের প্রলোভন দেখাত। যে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা এর সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত। কেউ বিক্রির জন্য ক্রেতা সংগ্রহ করত, কেউ এটি সংরক্ষণ করত। এছাড়া ওই ইউরেনিয়াম বিক্রির জন্য চক্রটি একটি ভিডিও ব্যবহার করত। ৫০ হাজার টাকা ‘সিকিউরিটি মানি’ রেখে তারা সম্ভাব্য ক্রেতাদের ওই ভিডিও দেখাত। আর কেউ সরাসরি দেখতে চাইলে ৫০ লাখ টাকা ‘সিকিউরিটি মানি’ চাওয়া হতো। তবে এখনও কারো কাছ থেকে কোনো টাকা নিতে পারেনি বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে বনানী থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে এই প্রথম পুলিশের হাতে ইউরেনিয়াম পদার্থ ধরা পড়েছে। উদ্ধারকৃত ইউরেনিয়াম ভরা ব্যাগটির গায়ে ইংরেজিতে ‘ইউরেনিয়াম অ্যাটোমিক ওয়েট-২২২.০৭ (এইউ)’ লেখা আছে। এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া অন্য জিনিসের মধ্যে রয়েছে রেডিয়েশন মাপার যন্ত্র, গ্যাস মাস্ক, তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র, রেডিয়েশন রোধক জ্যাকেট, হ্যান্ড গ্লাভস এবং ইংরেজি ও রাশিয়ান ভাষায় মুদ্রিত ক্যাটালগ।
কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘প্রায় ছয় মাস আগে সেনাবাহিনীর করপোরাল (অব.) আসলাম মিয়া তার পেনশনের ১২ লাখ টাকা দিয়ে ইউরেনিয়াম ব্যবসায় নাম লেখান। আসলামকে এ কাজে সহযোগিতা করেন তোফায়েল আহম্মদ পাটোয়ারী। আহম্মদ পাটোয়ারী প্রথমে আসলামকে জানান, লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যাবে। আসলাম লোভে পড়ে আরও কয়েকজন ধনাঢ্য ব্যক্তিকে এ সম্পর্কে বোঝান। একপর্যায়ে ১১ জনই এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।’
উপকমিশনার বলেন, ‘উদ্ধারকৃত ইউরেনিয়াম জঙ্গিদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। রাশিয়া থেকে এই ইউরেনিয়াম পার্শ্ববর্তী কোনো একটি দেশের সীমান্ত দিয়ে আনা হয়েছে। চামড়ার ব্যাগে এই ইউরেনিয়াম পাওয়া গেছে। আটককৃত বস্তুগুলো পুলিশের ধারণা ও অভিজ্ঞতার বাইরে হওয়ায় বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন ও বিসিএসআইআরে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা করা হবে।’
ইউরেনিয়াম সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পর্যায় সারণির ৯২তম মৌল ইউরেনিয়াম। এর প্রতীক ইংরেজি বর্ণ ‘ইউ’। এটি পর্যায় সারণির ৭ম পর্যায়ের ৩য় শ্রেণির ই উপশ্রেণিতে অবস্থিত। এটি মূলত তেজস্ক্রিয় এবং নীলাভ সাদা বর্ণের ধাতু। ১৭৮৯ সালে বিজ্ঞানী মার্টিন হাইনরিখ ক্ল্যাপরথ (Martin Heinrich Klaproth) ইউরেনিয়াম আবিষ্কার করেন। তিনি ইউরেনাস গ্রহের নামানুসারে এর নামকরণ করেন ইউরেনিয়াম। কারণ তখন ইউরেনাস গ্রহ আবিষ্কারের ঘটনা ছিল সবচেয়ে সাম্প্রতিক। কিন্তু প্রথম ইউরেনিয়াম সংশ্লেষ করা হয় ১৮৪১ সালে। এই সালে বিজ্ঞানী ইউজিন পেলিকট (Martin Heinric Eugene-Melchior Peliqoth Klaproth) ইউরেনিয়াম টেট্রাক্লোরাইড (UCl4) থেকে প্রথম ইউ সংশ্লেষ করেন। ১৮৬৯ সালে যখন দিমিত্রি মেন্ডেলিভ (উরসরঃত্র ওাধহড়ারপয গবহফবষবুবা) পর্যায় সারণি আবিষ্কার করেন তখন সবচেয়ে ভারী মৌল হিসেবে ইউ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৪০ সালে প্রথম ট্রান্স ইউরেনিয়াম মৌল তথা নেপচুনিয়াম আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত এটিই ছিল সবচেয়ে ভারী। ১৮৯৬ সালে বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেল ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। যখন পরিশোধন করা হয় তখন ইউরোনিয়ামের বর্ণ থাকে সোনালি সাদা। প্রকৃতি থাকে দুর্বল তেজস্ক্রিয় মৌল ধরনের, যা স্টিল থেকে কিছুটা নরম। ইউরোনিয়াম উচ্চ ঘনত্বের মৌল। এটি লেডের থেকে ৭০ শতাংশ বেশি ঘনত্বের।
ইউরোনিয়াম একটি উচ্চ ঘনত্বের তেজস্ক্রিয় মৌল, যা বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য পরমাণু চুল্লি এবং আনবিক বোমা তৈরিতে ব্যবহূত হয়।
(একে/আগস্ট ২৪, ২০১৪)