Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সবুজ পৃথিবী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-08-26
দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
ড.ফোরকান আলী : বেশিদিন আগের কথা নয়। মাত্র দুই যুগ আগেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো যশোর, খুলনা, সাতলমঘীরা জেলা ছিল সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামল, ধন-ধান্যে-সম্পদে-ঐতিহ্যে প্রাচুর্যমণ্ডিত। এই অঞ্চলের মানুষ নিরীহ, ধর্মভীরু ও অতিথিপরায়ণ। অর্থনৈতিকভাবেও ছিল সফল। অধিকাংশ মানুষই ছিল আত্মনির্ভরশীল।

অর্থনীতির মূল বুনিয়াদ ছিল কৃষি। আখ, পাট, মাছ, গবাদিপশু, মূল্যবান বৃক্ষাদি ছিল প্রধান সম্পদ। তবে তাঁত, বাঁশ, মৃত্তিকা, বেত এবং মাদুর শিল্পে এলাকার মানুষের আর্থিক উপার্জনের সহায়ক ছিল। এককালে এখানে কার্পাস ও গুটিপোকার চাষ হতো। এখানে প্রচুর সবজি, কলা, কুমড়া, হলুদ, কলাই, ডাল, তামাক উত্পাদন হতো— যা এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক বিকাশে অবদান রাখে।

এখানকার ছানা, দুধ, ঘি, মিষ্টি এক সময়ে প্রসিদ্ধ ছিল। কামার, কুমার, কাঠমিস্ত্রী, রাজমিস্ত্রীর খোদাই কাজ অবিভক্ত বাংলায় সুখ্যাতি বয়ে আনে। সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা, জেঠুয়া মাগুরা, তালা উপজেলা সদর, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা সদর, চুকনগর, কপিলমুনি, যশোরের নওয়াপাড়া রাজঘাট প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। পণ্যবহনের জন্য বাহারি বাণিজ্যিক নৌকায় ঠাসা থাকত কপোতাক্ষ, ভবদহ, ভৈরবসহ সব নদীর তীর। কিন্তু এ সব এখন অতীত। কপোতাক্ষ নদের প্রায় ৩০ কিঃ মিঃ এখন পলি পড়ে বিলুপ্ত হওয়ার পথে।

ফলে কপোতাক্ষের দু’কূলে যশোর-সাতক্ষীরা-খুলনার প্রায় ২০ লাখ মানুষ বছরে ছ’মাস পানিতে তলিয়ে থাকে। প্রায় ৫০ হেক্টর জমির ফসল ঘরবাড়ি ফি বছর বিনষ্ট হচ্ছে। মানুষ বাড়ি ঘর ছেড়ে স্কুল, কলেজ ও উঁচু রাস্তার পাশে আশ্রয় নেয়। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পানিবদ্ধতা নিরসন ও বন্যামুক্ত করতে খুলনা-যশোর-সাতক্ষীরার পানি নিষ্কাশন প্রকল্প, বিল উঁচুকরণ ও নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে টিআরএম প্রকল্প, বুড়িভদ্রা নদী এবং কপোতাক্ষ নদ খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও স্লুইস গেট নির্মাণসহ জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজে ২৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করা হলেও পানিবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

এ বছর বর্তমান সরকার ভবদহ অঞ্চলের পানিবদ্ধতা নিরসনের জন্য ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। পরিবেশ বিবর্তনের ফলে আজ নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে গেছে। ফলে হারিয়ে গেছে মূল্যবান সম্পদ। দানবরূপী মানুষের তাণ্ডবে এবং থাবা বিস্তারে বিনষ্ট হয়েছে ধান চাষের কৃষি ভূমি। যেখানে লাখ লাখ টন ধান উত্পাদন হতো সেসব জমিতে লোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষের ফলে বিনষ্ট হয়েছে ধান চাষের কৃষি ভূমি।

বর্তমানে খুলনাও সাতক্ষীরায় হাজার হাজার বিঘা চিংড়ি ঘের আছে। চিংড়ি চাষের ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছে হাজার হাজার কর্মজীবী কৃষক। একদিন পুরুষ-মহিলা সকলকে সারাবছর ব্যস্ত থাকতে হতো ধান-পাট কৃষিপণ্য উত্পাদন এবং এগুলো গুছিয়ে ঘরে উঠানোর জন্য।

কাজের ক্ষেত্র ছিল যথেষ্ট, তাই মাছ ভাতের অভাব হতো না। নদী-খাল-বিলে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এমনকি যশোরের কৈ মাছ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও সুনাম ও পরিচিত ছিল। তা দিয়েই সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন চলতো। প্রাকৃতিকভাবে সে সময় এত মাছ উত্পাদন হতো যে, এদেশ থেকে হাজার হাজার নৌকা ভরে ভারতে রফতানি হতো। আর এখন কৃষি ভূমি খাল-বিল লোনা পানিতে ভরে থাকে।

অপরদিকে কৃষকরা জমিতে বিষাক্ত কীটনাশক, প্রচুর রাসায়নিক সার ব্যবহার করে। যার ফলে যশোর খুলনা, সাতক্ষীরা অঞ্চলের চিরচেনা সবুজ শ্যামল রূপ আর নেই। গাছ-গাছালি বাড়িঘর লোনা আবহাওয়ায় বিনষ্ট হচ্ছে। চারদিকে তাকালে গ্রামগুলোকে বিরানভূমি মনে হয়। পশুসম্পদ বিলুপ্ত অথচ এখানকার বিলগুলো রাতভর গরু-মহিষে ভরা থাকতো।

মালিকরা গাভী মহিষ থেকে দিনে দু’বার দুধ পেত। ঘি, মাখন, মিষ্টির দাম ছিল অনেক কম। চিংড়ি ঘেরের প্রতুলতার কারণে কর্মহীন মানুষ আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে। চিংড়ি চাষ লাভজনক হলেও স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ছিল কৃষিজীবী মানুষের অন্যত্র কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, কিন্তু তা ঘটেনি। এ অঞ্চলে শিল্প কারখানা গড়ে উঠেনি। বরং এই এলাকার চালু কিছু কলকারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

কৃষক হারিয়েছে জমি, গবাদি পশু, গাছ-গাছালি সব মিলিয়ে এখানকার মানুষ এখন দারুণ কষ্টে আছে। দেশের পত্র-পত্রিকাগুলো উত্তরবঙ্গের মঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে বারবার রিপোর্ট প্রকাশ করলেও এই এলাকার মানুষের দুর্দশার কথা প্রকাশ করে না। বিভিন্ন সময়ে সরকার এখানকার পানিবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছু হয়নি। বরং নতুন করে কপোতাক্ষ ড্রেজিংয়ের অভাবে ভরাট হয়ে যাওয়ায় খুলনা-সাতক্ষীরা ও যশোরের বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়ে স্থায়ী পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সব এলাকার সমান উন্নয়নের কথা বলে আসছে। তাই বর্তমান সরকারের উচিত এই এলাকাকে অবিলম্বে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা ও কপোতাক্ষসহ সব নদী ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করা। আশা করি সরকারের সর্বোচ্চ মহল বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেবে এবং জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

(একে/আগস্ট ২৬, ২০১৪)