Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সবুজ পৃথিবী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-08-26
বিলুপ্তির পথে শামুক ঝিনুক
শামুকের পরিচিতি: শামুক নামের বস্তু বা প্রাণীর সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। ছোট-বড় সবাই শামুক সম্পর্কে কম-বেশি জানি। অর্থকরী প্রাণী শামুক আজ বিলুপ্তপ্রায়। বিভিন্ন জলাভূমি ও কৃষিজমি থেকে নির্বিচারে চলছে শামুক নিধন ও বিক্রি। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষি জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। শামুক নিয়ে এবারে লিখেছেন খোকন-

শামুক হচ্ছে মোলাস্কা (mollusca) পর্বের গ্যাস্ট্রোপডা ধেংঃত্ড়ঢ়ড়ফধ শ্রেণির প্রায় সব সদস্যের সাধারণ নাম। এরা নরমদেহী এবং প্রাপ্তবয়স্কদের দেহ একটি প্যাঁচানো খোলকে আবৃত থাকে। সাধারণত শামুক বলতে স্থলচর, সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির শামুককে বোঝায়। মরুভূমি, নদী ও স্রোতস্বিনী, বদ্ধ জলাশয়, জলাশয়, সমুদ্র উপকূলসহ অনেক আবহাওয়াতে শামুকের দেখা পাওয়া যায়।

স্থলচর শামুক বেশিরভাগ মানুষের কাছে পরিচিত হলেও এরা আসলে শামুকের জগতে সংখ্যালঘু। সামুদ্রিক শামুকেরাই বৈচিত্র্য ও সংখ্যায় অনেক বেশি এগিয়ে। স্বাদু পানিতে এবং এমনকি কটু পানিতেও শামুকের সংখ্যা প্রচুর। বেশিরভাগ শামুকই তৃণভোজী; তবে কিছু সামুদ্রিক শামুক প্রজাতি উভভোজী অথবা মাংসভোজী। শামুকের খোলক জ্যামিতিক স্পাইরাল বা প্যাঁচের আকারে তৈরি। বেশিরভাগ খোলকই ডানহাতি, অর্থাত্ যদি খোলকের কেন্দ্রের উঁচু অংশটি দর্শকের দিকে তাক করে থাকে, তবে প্যাঁচ বা স্পাইরালগুলো ঘড়ির কাঁটা যেদিকে ঘোরে সেদিকে ঘুরতে ঘুরতে এগোবে।

শামুকের উপকারিতা: ধানের জমিতে শামুকের ডিম খেয়ে ইঁদুর তার পেটপূর্তি করায় ধান নষ্ট করা থেকে বিরত থাকে। প্রাকৃতিক ও দেশীয় মাছের প্রধান খাদ্য হচ্ছে শামুকের ডিম ও মাংস। বিশেষ করে কৈ, শিং, মাগুর, ট্যাংরা, টাকি, শোল মাছের ডিম থেকে সদ্যোজাত পোনার একমাত্র খাদ্য হচ্ছে শামুকের নরম ডিম। আর এ খাবার না পেলে ওই পোনা মারা যায়। শামুকের খোলসের ভেতরের নরম অংশ চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হওয়াতে দক্ষিণাঞ্চলের ঘের মালিকেরা শামুক কিনে নিয়ে যায়।

ম্যাচোফেলিয়া ও মাইক্রোফেলিয়া নামে দুধরনের কীট শামুক থেকে খাবার সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। ওই দুটি কীট ধান গাছের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি ক্ষেতের ব্যাপক উপকার করে থাকে। অপরদিকে শামুক নিঃসৃত পানির রয়েছে নানা ঔষধি গুণ। প্রচলিত রয়েছে ঠাণ্ডা পাত্রে রক্ষিত শামুক নিঃসৃত পানি যেকোনো ধরনের চোখের রোগের জন্য খুবই উপকারী। শামুক-ঝিনুক দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে চুন এমনকি হাঁসের খাবারও জোগান দেয়া হয়। শামুক হচ্ছে প্রাকৃতিক ফিল্টার। শামুক-ঝিনুক পরিবেশের বিশেষ বন্ধু হিসেবে পরিগণিত। শামুক-ঝিনুক মরে গিয়ে তার মাংস ও খোলস পচে জমির মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ তৈরি করে। ফলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ ধানগাছের শিকড় মজবুত ও ফসল অধিক হতে সাহায্য করে।

অন্যদিকে জীবিত শামুক-ঝিনুক বর্ষা মৌসুমে আমন ধানের ব্যাপক উপকারে আসে। শামুক দূষিত পানি ফিল্টারিং করে প্রাকৃতিকভাবে পানি দূষণমুক্ত রাখে। শামুক নিধনের ফলে কৃষিজমি হারাচ্ছে উর্বরতা ও পরিবেশ হারাচ্ছে স্বাভাবিক ভারসাম্যতা। ফলে এলাকার পরিবেশে দেখা দিচ্ছে বিপর্যয়ের আশঙ্কা।

শামুকের বিচরণ: খাল, বিল, নদীনালা, বিভিন্ন ঝোপজঙ্গলে শামুকের বিচরণ। অধিকাংশ কৃষিজমি ও জলাভূমি বর্ষার মৌসুমে অর্থাত্ বৈশাখ মাসের শেষ দিক থেকে শুরু করে কার্তিক মাসের শেষ পর্যন্ত বর্ষার পানিতে ডুবে থাকে। এসব কৃষিজমি ও জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় অসংখ্য শামুক। শামুক নিরীহ জলজ প্রাণী হওয়ায় সহজেই একে কুড়িয়ে নেয়া যায়।
 
শামুকের আয়ু: বিভিন্ন প্রজাতির শামুকের আয়ু ভিন্ন ভিন্ন। প্রকৃতিতে আকাটিনিডে শামুক ৫ থেকে ৭ বছর বাঁচে, আবার হেলিক্স প্রজাতির শামুক ২ থেকে ৩ বছর বাঁচে। অ্যাকোয়াটিক অ্যাপল জাতের শামুকের আয়ু মাত্র বছরখানেক। বেশিরভাগ শামুকের মৃত্যু হয় শিকারির হাতে আর নয়তো পরজীবী দ্বারা।

গৃহবন্দি অবস্থায় শামুকের আয়ু অনেক বেশি হয়, বেশিরভাগ প্রজাতির ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। কিছু কিছু শামুকের আরও বেশি, প্রায় ৩০ বছর পর্যন্তও বাঁঁচার নজির রযেছে। কিছু শামুক ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাস নেয়। এদেরকে পালমোনাটা বলে। অন্যদিকে যেসব শামুক ফুলকা জাতীয় অঙ্গের সাহায্যে শ্বাস নেয় তাদেরকে প্যারাফিলেটিক দলে ফেলা হয়। স্থলচর শামুকদের মাথায় দুইজোড়া কর্ষিকা থাকে যা শামুকের দরকার পড়লে গুটিয়ে রাখতে পারে। পেছনের কর্ষিকাজোড়ায় থাকে চোখ। জলজ শামুকদের একজোড়া গোটানোর অনুপযোগী কর্ষিকা থাকে যার গোড়ায় চোখ থাকে।

শামুকের শারীরিক বৈশিষ্ট্য: বেশিরভাগ শামুকই এপিথেলীয় সিলিয়া দ্বারা আবৃত পেশল পায়ের সাহায্যে পিছলে চলে, এই পা মিউকাসের সাহায্যে পিচ্ছিল হয়ে থাকে। পায়ের পেশিতে পরপর ঘন ঘন সঙ্কোচন ঘটিয়ে শামুক চলাচল করে। অ্যাকোয়ারিয়ামের দেয়াল বেয়ে উঠতে থাকা শামুকের দিকে তাকালে পেশির এই নড়াচড়া স্পষ্ট দেখা যায়। শামুকের চলার গতি অত্যন্ত ধীর (পূর্ণবয়স্ক হেলিক্স লুকোরাম প্রজাতির শামুকের ক্ষেত্রে ১ মিমি/সেকেন্ড স্বাভাবিক গতি)। শামুকের পায়ে থাকা মিউকাস ঘর্ষণ কমিয়ে তাদের পিছলে চলাতে সাহায্য করে। এই মিউকাস ধারালো বা তীক্ষ বস্ত লেগে শামুকের দেহ কেটে যাওয়া থেকে বাঁচাতেও সাহায্য করে। এই কারণে শামুক ধারালো বস্তু যেমন রেজর বা ব্লেডের ওপর দিয়ে চলতে পারে কিন্তু তাতে তাদের দেহ কেটে ছিঁড়ে যায় না।

শামুক বিলুপ্তির পথে কেন?
এমন একটা সময় ছিল যে সময় কৃষি ক্ষেত শুরু করে মাঠে ময়দানে পা রাখলেই শামুকে দেখা মিলত। রাস্তা দিয়ে সারিবদ্ধভাবে হাঁটতে দেখা যেত। আজ তা বিলুপ্তপ্রায়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, ফসলি বা কৃষিজমিতে কীটনাশক ব্যবহার, মানুষের অবাধ নিধনের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে শামুকঝিনুক। প্রকৃতির জীববৈচিত্র্যের ধ্বংসলীলা যদি বর্তমান হারে চলতেই থাকে তাহলে আমারা যে উন্নতি প্রত্যাশা করছি তা গলার ফাঁস হয়ে উঠতে আর বেশি সময় লাগবে না।

পরিশেষে বলতে চাই শামুক-ঝিনুক পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিবেশ সহায়ক এ শামুকের অপরিকল্পিত ও অবাধে নিধন প্রতিরোধ না করলে শীঘ্রই প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ফসল উত্পাদন মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শামুকের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র তৈরি ও সংরক্ষণের এখনই পদক্ষেপ না নিলে এটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই শামুকের অভযারণ্য তৈরির পাশাপাশি শামুক নিধন বন্ধে সবার সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এই ধারাবাহিকতায় নির্বিচারে শামুক নিধন হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীবজগতের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আসুন আমাদের এই সম্পদ রক্ষায় আমরা সকলে এগিয়ে আসি। পরিবেশ রক্ষা করি। কৃষি ও ফসলি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করি।

(একে/আগস্ট ২৬, ২০১৪)