Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সবুজ পৃথিবী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-08-26
জলবায়ু পরিবর্তনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
শফিকুল ইসলাম খোকন : বর্তমানে সারা বিশ্বে চলছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। এ আতঙ্ক কিংবা ক্ষতি থেকে রেহাই পাবে না বাংলাদেশেও। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য।

অথচ আমরা এর অন্যতম প্রধান শিকার। অনিয়মিত বন্যা, সাইক্লোন, খড়া এবং ভূমিকম্প কৃষিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং পানি সম্পদ, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং নগর উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এর প্রভাব থেকে রেহাই পাবে না প্রাণবৈচিত্র্য ও পৃথিবী একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়বে উপকূলের বেড়িবাঁধ, মত্স্য সেক্টর, গবাদি পশু, ঘরবাড়ি ও গাছপালা।

বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বহুল আলোচিত বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, তা পৃথিবীকে কতটুকু বিপর্যয়ের সম্মুখীন করবে, মানুষকে কতটা আশ্রয়হীন অথবা বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেবে তা জানতে আজ কারো বাকি নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে দুর্যোগ অপেক্ষা করছে তা মোকাবিলায় তাই সারা পৃথিবীর মানুষ একজোট।

জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এই বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নীতিগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অনেক উন্নত দেশের তুলনায়ও আমরা এগিয়ে রয়েছি বলে একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

কিন্তু আশা জাগানিয়া এই লাইনের পরই যা উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে তা আমাদের জন্য রীতিমতো আতঙ্কের। কারণ নীতি-নির্ধারণ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। অথচ এসব নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার অভাব প্রকট।
 
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্প প্রণয়ন ও অর্থায়নে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারি তত্পরতা পর্যালোচনা, বিশেষজ্ঞ ও অ্যাকটিভিস্ট পর্যায়ের কাজে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। এক্ষেত্রে গৃহীত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, প্রকল্প ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেই রয়েছে সমন্বয়হীনতা।

ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা কর্মসূচির অর্থ ছাড়াও সময়, শ্রম ও মেধার অপচয় হচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন সূচিত হওয়ার বিষয়টি ২০০৭ সালে প্রকাশিত আইপিসিসির চতুর্থ প্রতিবেদনে নিশ্চিত হলেও বাংলাদেশে ‘নাপা’ বা ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান অব অ্যাকশন প্রণীত হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৯ সালে চূড়ান্ত হয় বাংলাদেশে ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (বিসিসিএসএপি)। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি যুক্ত করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ।

এছাড়া ২০১২ সালে চূড়ান্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে জলবায়ু পরিবর্তনের সংজ্ঞা, অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিধানও রাখা হয়। বর্তমান সরকারের ‘রূপকল্প-২০২১’ বা ভিশন টোয়েন্টি টোয়েন্টি ওয়ান এবং এর অধীনে গৃহীত সরকারি পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনাতেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের কথা রয়েছে।

অথচ মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। আর এই না মেলার পেছনে রয়েছে সমন্বয়হীনতার অভাব।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমবে ২ শতাংশ : বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ২ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)।

সমপ্রতি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এডিবি প্রকাশিত জলবায়ু এবং অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে এতথ্য উঠে আসে। আর চলতি শতাব্দী শেষে এই ক্ষতি হতে পারে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ করে।

প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার ৬টি দেশের নাম উল্লেখ করা হয়। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা।

দেশগুলোর বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব অব্যাহত থাকলে এখানে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সময়ে গড়ে জিডিপিতে ১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে ক্ষতি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা না করা হলে ২১০০ সাল নাগাদ জিডিপিতে এই ক্ষতির পরিমাণ ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। আর এই শতাব্দীতে সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা আরও প্রকট হলে চলতি শতাব্দী শেষে জিডিপিতে ক্ষতির পরিমাণ ৯ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে এই ক্ষতি ২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছে এডিবি।

প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনে মালদ্বীপ ও নেপাল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। চলতি শতাব্দী শেষে দেশ দুটির অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১২ দশমিক ৬ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। এই ক্ষতি বাংলাদেশের ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ভারতের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ভুটানের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।

বছরে ক্ষতি জিডিপির এক শতাংশ : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর আমাদের জিডিপির এক শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি পশ্চিমা বিশ্বের সৃষ্টি। কিন্তু নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা গ্রিন হাউসের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সোচ্চার হতে হবে। জলবায়ু সংক্রান্ত পঞ্চম প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সমপ্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ সব কথা বলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। মানুষ ওই সমস্ত এলাকা থেকে রাজধানীতে এসে জীবিকার সন্ধান করবে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

এ ছাড়া উন্নত বিশ্বের অতিমাত্রায় কার্বণ নিঃসরণের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। যার ফলভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশের সাধারণ মানুষকে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ তাপমাত্রা বর্তমানের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি বাড়বে। তাপমাত্রা ২ ডিগ্রির বেশি বাড়তে দেয়া পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

এর  ফলে ধান উত্পাদন কমবে আট ভাগ, গম উত্পাদন কমবে ৩২ ভাগ। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে।

এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ টিকে থাকতে বর্তমান পেশা পরিবর্তন করবে, ফলে জীবিকা নির্বাহে সমস্যার সৃষ্টি হবে। আর এ থেকে বেরিয়ে আসতে উন্নত বিশ্বের দেয়া আশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

জলবায়ুজনিত ক্ষতিপূরণ আদায়ে তত্পর হতে হবে : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সেই আনুযায়ী ক্ষতিপূরণ আদায়ে তত্পরতা চালাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটবে তা মোকাবেলার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, সেই ক্ষতি পুশিয়ে নিতে বাংলাদেশকে যে পরিমাণ অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে উন্নত দেশেগুলো তা তারা পূরণ করেনি। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করাতে বাংলাদেশকেই তাদের ওপর চাপ দিতে হবে।

বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত ক্ষতি বিষয়ক আলোচনাগুলো অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। তাই এই বিষয়ে আমাদের সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের মতো এত বড় এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারকারী ইস্যু কারো একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সবার সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও এগিয়ে আসতে হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়।

আর সরকারি পর্যায়ে নীতি-নির্ধারণী ক্ষেত্রে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় অতি গুরুত্ব এবং আলাদাভাবে প্রাধান্য দিতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে সকল প্রকার সমন্বয়হীনতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে।

(একে/আগস্ট ২৬, ২০১৪)