Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সারাদেশ
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-09-02
দেশের বিভিন্ন স্থানে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ
বর্তমান প্রতিবেদক : দেশের বিভিন্ন স্থানে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসি মানুষ। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি খাদ্য সঙ্কটেও পড়েছে এসব মানুষ। এছাড়া বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১০ লাখেরও বেশি হেক্টর জমির ফসল বন্যায় ডুবে যাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা চরম বিপদে পড়েছেন। দীর্ঘদিন পানির নিচে ডুবে থাকায় এসব ফসল পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে, শেরপুর বন্যায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। বগুড়ার তিনটি উপজেলা সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় বন্যার কারণে একের পর এক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। জেলার তিনটি বন্যাকবলিত উপজেলার ১২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। সারিয়াকান্দি উপজেলায় একটি উচ্চ বিদ্যালয়সহ ৪৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও পাঠদান চালু করতে পারেনি। ফলে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুস সালাম জানান, জেলার তিনটি বন্যাকবলিত উপজেলার ১২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে সারিয়াকন্দি উপজেলায় ৭৪টি, সোনাতলায় ১৩টি এবং ধুনটে ৩৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় তলিয়ে যাওয়ায় এসব স্কুলের পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে।
ধুনট উপজেলা পরিষদের ক্যাম্পাসে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পরিষদের দক্ষিণ অংশে পানি প্রবেশ করায় স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া উপজেলার প্রায় ১৭০টি গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। বন্যায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার কাঁচা ও ৪০ কিলোমিটার পাকা রস্তার ক্ষতিসাধন হয়েছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও করতোয়াসহ সবগুলো নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে ঘাঘট নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ১০ সেমি ওপরে। ফলে বন্যাকবলিত লোকদের নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির সংকট এখন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যায়  সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসময় ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে ১৭ হাজার ৭৪টি। বন্যায় ৩৬ হাজার কৃষকের ৩ হাজার ৪২৯ হেক্টর ফসলি জমি বিনষ্ট হয়েছে। এদিকে বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটেছে। গাইবান্ধা সিভিল সার্জন অফিস জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত এলাকায় ৫০টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে।
সাঘাটায় ৩০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বন্ধ, সাঘাটা উপজেলায় বন্যার কারণে ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে হতাশ হয়ে পড়েছে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নে ১৯টি, জুমারবাড়ী ইউনিয়নে ৬টি, ঘুড়িদহ ইউনিয়নে ১টি এবং সাঘাটা ইউনিয়নে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করেছে।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে ১৬টি নদ-নদীর পানি কমলেও এখনও পানিবন্দি মানুষ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। বন্যার পানি কমলেও বাড়ি থেকে পানি না সরায় উঁচু বাঁধ থেকে এখন পর্যন্ত ঘরে ফিরতে শুরু করেনি এসব বানভাসি মানুষ।
নাগরপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের নাগরপুরে বন্যার পানির উন্নতি হলেও রাস্তাঘাটসহ প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির বিভিন্ন প্রকার ফসল এখনো পানির নিচে। বন্যায় রোপা আমন, শাক-সবজি, ভুট্টাসহ ফসল তলিয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার খেটেখাওয়া কৃষকরা। এছাড়া বন্যায় ভেসে গেছে পাঁচ শতাধিক পুকুরের মাছ।
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, উজান ও বৃষ্টির পানিতে বনগ্রাম, করগাঁও, চান্দপুর, মুমুরদিয়া, ধূলদিয়া, আচমিতা, মসূয়া, জালালপুর, লোহাজুরী ও পৌর এলাকার ২৫ হেক্টর বীজতলা এবং প্রায় ১২২৫ হেক্টর রোপিত আমন ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৮ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি ৫-৭ দিনের মধ্যে পানি না কমে তাহলে খাদ্যঘাটতির আশঙ্কাও রয়েছে।
মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, শিবচরে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় শত শত ঘরবাড়ি ও দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আরো চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন ভাঙনের মুখে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ৩ সেমি পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার ৩২ সেমি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার ভাঙনে শিবচরের চরজানাজাত ও আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে বহেরাতলা ও সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের শত শত ঘরবাড়ি, শত বছরের পুরনো মসজিদ ও পূর্বপুরুষদের কবরস্থান বিলীন হয়ে গেছে। গত কয়েকদিনের ভাঙনে চরজানাজাত ইউনিয়নের ১১টি গ্রামের সাতশ পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো এক মাস ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের আংশিক আড়িয়াল খাঁ নদে ও চরজানাজাতের এমএস দাখিল মাদ্রাসা পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। এদিকে চরজানাজাতের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ও সন্ন্যাসীরচর উচ্চ বিদ্যালয়সহ ৪০টি দুস্থ পরিবারের সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প হুমকির মুখে; যে কোন সময় বিলীন হয়ে যেতে পারে। এখানে ৩টি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি জানান, শেরপুরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নতুন করে শেরপুরের শ্রীবরদীর ভেলুয়া ইউনিয়নের ১৮টি গ্রামের মধ্যে ১১টি গ্রামই বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। গ্রামগুলো হচ্ছে লক্ষীডাংড়ি, নয়াপাড়া, চকবন্দি, ঢনঢনিয়া, তিনানী ভেলুয়া, চরশিমুলচড়া, কাউনেরচর, ডাকরা পাড়া, বারারচর, বলদেপাড়া ও যষ্টিপাড়া। এদিকে ১ সেপ্টেম্বর সোমবার বিকেলে বন্যার পানিতে ডুবে সদর উপজেলার বেতমারী-ঘুঘুরাকান্দি ইউনিয়নের মধ্য চরখারচর গ্রামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহত মেরিনা বেগম (৮) ওই গ্রামের হানিফ মিয়ার মেয়ে। আর এ নিয়ে স্কুলছাত্রসহ চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে ।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, মির্জাপুর উপজেলায় বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লৌহজং নদীতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে লৌহজং নদীর কোর্টবহুরিয়া, বহুরিয়া, গেরামারা, গুনটিয়া, চুকুরিয়া, উফুলকী, বরাটি, বাগজান, মাঝালিয়া ও ধানকি এলাকার কয়েক শতাধিক পরিবার গৃহহারা হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে ।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, চৌহালী উপজেলার প্রায় ২৫০ মিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ প্রায় তিন শতাধিক ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার। এসব পরিবারের লোকজন আশ্রায় নিয়েছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সরকারি পরিত্যক্ত জায়গায়। অপরদিকে এনায়েতপুর স্পার বাঁধের ৩৫ মিটার নদীতে বিলীন হওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ১২শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, খাজা এনায়েতপুরীর (র.) মাজার, বহুতল মত্স্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট ও বহু তাঁত কারখানাসহ অসংখ্য ঘর-বাড়ি, চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন।
যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও মঙ্গলবার সকালে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলার ৭টি উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নের প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পুনরায় পানিবন্দি হয়ে পড়ে। বন্যায় তলিয়ে গেছে এসব উপজেলার প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর আবাদি জমির ফসল।
(সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৪)