Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
প্রচ্ছদ » বাংলার মুখ
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-09-09
নরসিংদী তিতাসে বৈধের চেয়ে অবৈধ গ্রাহক তিনগুণ
আবুল বাশার বাছির, নরসিংদী
নরসিংদীতে তিতাস গ্যাসে নিয়ে চলছে হরিলুট। একটি চক্র অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে লুফে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। প্রতিমাসে জ্বলছে প্রায় ৩০ কোটি টাকার গ্যাস। কিন্তু সরকারের পকেটে যাচ্ছে না এক কানাকড়িও। এ অবস্থায় বৈধ গ্রাহকের চেয়ে অবৈধ গ্রাহক সংখ্যা তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। ডমেস্টিক গ্যাস লাইনের পর এবার মহাচোরেরা হাত বাড়িয়েছে জাতীয় গ্রিড লাইনে। গ্যাসের অভাবে সরকার দেশের বৃহত্ দুটি সারকারখানার উত্পাদন বন্ধ করে দিলেও জেলায় চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের এ মহোত্সব। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জাতীয় গ্রীডের ১৬ ইঞ্চি পাইপ ছিদ্র করে এ অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া হচ্ছে।  এ চক্রকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে তিতাস গ্যাস আঞ্চলিক বিক্রয় কেন্দ্র চিনিশপুর নরসিংদীর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও লাইনম্যানরা। তিতাস গ্যাস আঞ্চলিক বিক্রয় কেন্দ্র চিনিশপুরের সহকারী ম্যানেজার (রেভিনিউ) জগদিশ চন্দ্র বর্হ্মণ জানান, জেলায় মোট আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার, বাণিজ্যিক তিনশত এবং শিল্প ও কলকারখানায় তিনশত ১৫টি। তাদের কাছে গত ৩০ জুন পর্যন্ত  বকেয়া প্রায় দেড় কোটি টাকা। এদিকে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে জানা গেছে বর্তমানে এ জেলায় অবৈধ্য গ্যাস ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।  বৈধ গ্রাহকের চেয়ে অবৈধ গ্রাহকের সংখ্যা তিনগুন বেশি। গত ৪০ বছরে যেখানে বৈধ গ্রাহকের সংখ্য মাত্র প্রায় ২২ হাজারের মতো সেখানে গত দুই বছরে অবৈধভাবে কেমন করে ৬৫ হাজারের মতো সংযোগ নেয়া হলো এমন প্রশ্নেরও কোনো জবাব দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, প্রতিটি সংযোগ থেকে গড়ে ত্রিশ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্রটি। সেই হিসাবে ৬৫ হাজার পরিবার থেকে এই চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে প্রায়   ঊনিশশত পঞ্চাশ কোটি টাকা। প্রতিটি চুলার বিল বাবদ সরকারের পকেটে চারশত পঞ্চাশ টাকা করে যাওয়ার কথা থাকলেও এ সংযোগ অবৈধ বিধায় এ টাকাও যাচ্ছে এ চক্রের পকেটে। এসব সংযোগ বৈধ হলে সরকারের প্রতিমাসে আয় হওয়ার কথা প্রায় ৩০ কোটি টাকা। কিন্তু এ টাকাও পাচ্ছে না সরকার। খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, অবৈধ গ্যাস সংযোগকারীরা এ টাকার কমবেশি ভাগ দিচ্ছে চারটি সংস্থাকে। এরা হলো তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য, স্থানীয় মাস্তান ও চাঁদাবাজ এবং  নামধারী কিছু অসাধু সাংবাদিক। লাইন স্থাপনের জন্য গর্ত খোঁড়া হলেই আচমকা বাহিনী সেখানে হাজির হয়। আর হাজির হলেই নজরানা ছাড়া ফিরে আসে না। সে কারণে মামলার পরও আসামি ধরতে যত অনীহা। তিতাস গ্যাস আঞ্চলিক বিক্রয় কেন্দ্র চিনিশপুরের ম্যানেজার তৌহিদুর রহমান জানান, চক্রটি প্রতি সেকেন্ডে হাজার পাউন্ড গ্যাসের চাপ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় গ্রিডের ১৬ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পাইপ লাইনে ছিদ্র করে ফেলেছিল। এ লাইন থেকে বাড়িঘরে গ্যাস সংযোগের কাজ চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক।
যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। এছাড়া এসব অবৈধ সংযোগের ফলে জাতীয় গ্রিডেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবাসিক ও শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে। এ দুঃসাহসিক কাজের সাথে এলাকার ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি জড়িত থাকায় ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না বলেও জানান তিনি। তিনি আরও জানান, চোরাই সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে তিতাসের সংযোগ বিচ্ছিন্নকারী দল ঘটনাস্থলে গেলে তারা গ্রামের মানুষকে ভুল বুঝিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে দা, লাঠি ও ঝাড়ু নিয়ে বিচ্ছিন্নকারী দলকে প্রতিহত করার আহ্বান জানায়। অতি সম্প্রতি রায়পুরা উপজেলার আমীরগঞ্জে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা  পুলিশ-গ্রামবাসীর ধাওয়া পাল্টাধাওয়া চলে। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্যাস কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী সমঝোতা বৈঠক শেষে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে ফিরে আসতে হয়। কিছুদিন  পরে অবশ্য জাতীয় গ্রেডের এ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ১৬ ইঞ্চি ছিদ্র বন্ধ করা হয়। কয়েকটি স্থানে প্রায় ৩০ হাজার লাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার এক ঘণ্টার মধ্যেই লাইনগুলোতে আবার সংযোগ দেয়া হয়েছে। এলাকাবাসী জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সাথে কথা বলেই তারা সংযোগ স্থাপন করেছেন। জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও নরসিংদী-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম হীরু স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আমি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেইনি, দেব না। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক ও গ্যাসের ডিজিএমকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে কিন্তু কি কারণে অ্যাকশনে যাচ্ছে না তা দ্রুত খতিয়ে দেখা হবে।
ঘোড়াশাল সার কারখানার সিবিএর সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানান, গ্যাসের অভাবে সরকার দেশের বৃহত্ ঘোড়াশাল সার কারখানা ও পলাশ সার কারখানাসহ দুটি সার কারখানার উত্পাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এরপরও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকার শিল্প-কারখানাগুলোতে উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। সমস্যা দেখা দিয়েছে বাসাবাড়িতেও। কিন্তু এর পরও থেমে নেই মহাচোরেরা। তিতাস গ্যাস বিক্রয় আঞ্চলিক কার্যালয় চিনিশপুরের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী শেখ আবু রায়হান অবৈধ গ্যাস সংযোগের কথা স্বীকার করে জানান, জাতীয় গ্রিডের গ্যাস লাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস লাইন নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-নরসিংদী-ডেমরা জাতীয় গ্রিডের গ্যাস লাইনটি ১০০০ পাউন্ড গতির। এই লাইন থেকে কোনোভাবেই আবাসিক বিতরণ লাইনের সংযোগ নেয়া সম্ভব নয়। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভবনা। কারণ আবাসিক বিতরণ লাইনের গতি সর্বোচ্চ এক হাজার ভাগের এক ভাগের এক-চতুর্থাংশ। তাই এটি যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।