Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
প্রচ্ছদ » উপ-সম্পাদকীয়
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-09-09
স্বাধীনতাবিরোধীচক্র এখনও সক্রিয়
মাহমুদুল বাসার
গত ৩১ আগস্ট ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধীরা এখনও প্রবলভাবে সক্রিয়। ১৯৭১ সালে যারা ইয়াহিয়ার পা-চাটা কুকুর ছিল, তারা বাংলাদেশের অগ্রগতি ব্যাহত করতে চায়। তারাই ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট ও ১৭ আগস্টের ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অগ্রগতি থামানো যাবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের বক্তৃতায় কিছুটা কঠোরতা থাকলেও ছিল নির্মম সত্যের প্রতিধ্বনি। তিনি এর আগের একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির নেই যে, স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশের উন্নতি করেছে।’ তাত্পর্যপূর্ণ কথা। কিন্তু আমরা ১৯৭২ সাল থেকেই লক্ষ্য করে আসছিলাম যে, স্বাধীনতার চেতনা যেন ভোঁতা হতে চলেছে। অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘বাংলার বাণী’তে আমি ‘রাজাকারের ক্রমবিকাশ’ নামে ধারাবাহিক একটি কলাম লিখেছিলাম। তাতে দেখিয়েছিলাম যে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্টের ট্র্যাজেডির আগেই নানা ছদ্মবেশে, মিষ্টি কৌশলে বাংলাদেশের প্রশাসনে স্বাধীনতাবিরোধীরা প্রশ্রয় পেয়ে গেছে। জনপ্রিয় কলাম লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘ইতিহাসের রক্তপলাশ পনেরই আগস্ট’ এবং চরমপত্রখ্যাত এমআর আখতার মুকুলের ‘মুজিবের রক্ত লাল’ বইতে আছে অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী আমলা-অফিসাররা প্রশাসনে জেঁকে বসেছিল। কথায় কথায় বঙ্গবন্ধুর প্রশস্তি গাইত কিন্তু সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর গুলি খাওয়া বাঘের মতো জেগে উঠেছিল ওরা পাকিস্তানি চেতনায়।
ড. মুনতাসীর মামুনের একটি কলাম থেকে এ কথা জেনে তাজ্জব বনে গেছি যে, বঙ্গবন্ধুর খুনি ডালিমও ‘বীরউত্তম’ খেতাব পেয়েছিল। ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানী লন্ডনে গিয়েছিলেন চিকিত্সার জন্য। তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল ডালিম। মওলানা ভাসানী ডালিমকে বলেছিলেন, ‘এই বুড়া সারা জীবন যা করতে পারে নাই, তুই আর তোর সাথীরা ১৫ আগস্ট সেই কাজ কইরা জালেমের হাত থেকে দেশ বাঁচাইছোস।’
এ কথা ডালিম তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছে। এ কথা অবিসংবাদিতভাবে সত্য যে, পাকিস্তান ফেরত বাঙালি আর্মিরা ১৫ আগস্টের বিপর্যয় ঘটিয়েছে। তদুপরি আমাদের দু’জন মুরুব্বী দেশ স্বাধীনের পরপরই স্বাধীনতার মূল্যবোধের বিপরীত বিন্দুতে দাঁড়িয়ে তাদের অভিমত প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। এদের একজন আবুল মনসুর আহমদ, অন্যজন মওলানা ভাসানী। দ্বিজাতিতত্ত্বকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে যেখানে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেখানে আবুল মনসুর আহমদ বলতে শুরু করলেন যে, দ্বিজাতিতত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। এও বললেন যে, বাংলাদেশ কোনো সেক্যুলার দেশ নয়, মুসলিমপ্রধান দেশ। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী স্বাধীন দেশে সরাসরি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, ‘যারা মুসলিম বাংলা কায়েম করতে চায়, তাদের আমি দুই হাত তুলে দোয়া করি।’
(ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া, বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ)। তত্কালে সোচ্চার কণ্ঠে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘হিন্দু খাদ্যমন্ত্রী বলেই ভারতে খাদ্য পাচার করছে। হিন্দুরা, তোমাদের দশা বিহারিদের দশা হবে।’ (শওকত ওসমান, রাজনৈতিক কার্বালঙ্কার-ইতিহাসে বিস্তারিত)।
এসব উল্টো হাওয়ার কথা দেশে স্বাধীনতার মূল্যবোধকে যেমন ভোঁতা করে দিচ্ছিল, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বাতাবরণ তৈরি করেছিল। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তাদের জবানবন্দিতে বলেছে যে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রেখে দেশের পরিবর্তন সম্ভব ছিল না। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল তিনি পাকিস্তান ভেঙে একটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে সত্যি সত্যি নামে মাত্র বাংলাদেশ ছিল, জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে ফেলেছিল। রাজাকাররা প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্পিকার পর্যন্ত হয়েছে। প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে। রাজনীতিতে টাকা একটি বড় ফ্যাক্টর। অ্যাঙ্গেলস বিত্তের মালিক না হলে মার্কস ‘পুঁজি’ বইটি লিখতে পারতেন না। এজন্য জামায়াতে ইসলামী বুদ্ধি করে অর্থের উত্স প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা দেশের বেকারত্বকে কাজে লাগিয়েছে।
কিন্তু ঘটনার এক পিঠ বিশ্লেষণ করলে লাভজনক হবে না। শেখ ফজলুল হক মনি তার ‘দুরবিনে দূরদর্শী’ কলামে লিখেছিলেন, ‘মোনায়েম খানের আমলা দিয়ে মুজিবের প্রশাসন চলতে পারে না।’ বঙ্গবন্ধুর সরকারকে সচেতন করার জন্যই মনিভাই কথাটি বলেছিলেন। বিদ্বান ও ক্ষুরধার বুদ্ধিমান শেখ মনি ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন, ‘বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লব আসবে।’ এই নামে একটি প্রবন্ধ লিখে জানিয়েছিলেন, ‘লেনিনের চেয়ে কেরেনেস্কির জনপ্রিয়তা বেশি ছিল, কিন্তু লেনিনের ছিল প্রশাসনিক বুদ্ধি ও সচেতনতা। প্রশাসনে তিনি তার লোকজন ঠিকমতো সেট করে ফেলেছিলেন। এ জন্য ইতিহাসে লেনিন টিকে গেছেন।’
বঙ্গবন্ধুর বেলায় এর ব্যতিক্রম ঘটেছিল। তদুপরি স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের পরস্পর অনৈক্য ও দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল। প্রত্যক্ষ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে স্বার্থমগ্নতায় পেয়ে বসেছিল। রাজাকারের সঙ্গে অনেকে অর্থবিত্তের লোভে আত্মীয়তাও করেছিলেন। স্বাধীনতার শত্রুদের ধারাল নখর সম্পর্কে অবচেতন হয়ে পড়েছিলাম আমরা। আমাদের কতক অবিমৃষ্যতায় পেয়ে বসেছিল। এই সুযোগ স্বাধীনতার শত্রুরা নিয়েছিল। তাদের অপপ্রচার ছিল অত্যন্ত ধারাল।
১৫ আগস্টের পরে স্বাধীনতার শত্রুরা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়ে চূড়াস্পর্শী সোচ্চার হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি পরপর তিনবার ক্ষমতায় আসার পরও তাদের উদ্ধত-স্পর্ধা অবনমিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মনে রাখতে হবে যে, অতীতে স্বাধীনতাপক্ষের লোকজনের শৈথিল্য স্বাধীনতার শত্রুরা কাজে লাগিয়েছে। এখনো স্বাধীনতার মূল্যবোধে বিশ্বাসী, সংবিধানের চার মূলনীতিতে বিশ্বাসী লোকেরা ঐক্যবদ্ধ না হলে বিপদ ঘটতে বিলম্ব হবে না। য়

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক