Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
প্রচ্ছদ » উপ-সম্পাদকীয়
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-09-09
মাও সেতুং আধুনিক চীনের স্থপতি
মোস্তফা কামাল
আজ ৯ সেপ্টেম্বর, আধুনিক চীনের স্বপ্নদ্রষ্টা মাও সেতুংয়ের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর চীনের হুনান প্রদেশের শাওশান গ্রামে মাও সেতুং জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন ধনাঢ্য কৃষক আর মা ছিলেন বৌদ্ধধর্মে অন্তঃপ্রাণ। আট বছর বয়সে মাও গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু তেরো বছর বয়সে তাদের পারিবারিক খামারে কাজের জন্য স্কুল ত্যাগ করেন। এরপর হুনান প্রদেশের রাজধানী চেং সার এক সেকেন্ডারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন।
১৯১১ সালে মাওয়ের বয়স যখন আঠার, তখন চীনের জীর্ণপ্রায় চিং রাজবংশের বিরুদ্ধে বিপ্লব দানা বাঁধতে শুরু করে। এ সময়ে মাও হুনান প্রদেশের বিপ্লবী সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে দোর্দণ্ড প্রতাপে শাসন করে আসা চিং রাজবংশের গণবিপ্লবের মুখে অল্পদিনের মধ্যেই পতন ঘটে।
এরপর ১৯১৮ সালে মাও হুনান প্রদেশের ফার্স্ট প্রভিন্সিয়াল নর্মাল স্কুল থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি তার শ্বশুর প্রফেসর ইয়াং চেং ঝির সাথে বেইজিং আসেন।  প্রফেসর ইয়াং চেং ঝি ছিলেন বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। শ্বশুরের সুপারিশে তিনি বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসেবে চাকরি পান। লাইব্রেরির কিউরেটর লি দা ঝাও ছিলেন বামপন্থী বুদ্ধিজীবী। তার চিন্তাধারায় মাও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। তরুণ বয়স থেকেই মাও বামপন্থী রাজনৈতিক ধ্যানধারণার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯২০ সালের দিকে তিনি একজন মার্ক্সবাদী হিসেবে চীনা রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন।
প্রজাতান্ত্রিক শাসনের শেষভাগে অর্থাত্ ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি জাতীয়তাবাদী চিয়াং কাইশেক সরকারের সাথে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ১৯৩৭ সালে চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হলে পরস্পরবিরোধী জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাইশেকের ন্যাশনাল পার্টি এবং মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি আগ্রাসী জাপানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে ১৯৪৫ সালে জাপান পরাাজিত হয়। তারপর শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। চীন-জাপান যুদ্ধে এবং গৃহযুদ্ধে চীনের প্রায় ১ কোটি বেসামরিক লোক নিহত হয়। গৃহযুদ্ধে জয়ী কমিউনিস্ট পার্টি মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চীনের বিশাল ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর বিজয়ী কমিউনিস্ট মুক্তিফৌজের অগ্রগামী অংশ ক্যান্টনে প্রবেশ করলে চিয়াং কাইশেক সদলবলে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে পালিয়ে ফরমোজা দ্বীপে আশ্রয় নেন। ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মাও স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এ পদে বহাল থাকেন।
১৯৪৯ সালে মাও যখন ক্ষমতায় আসেন তখন চীনের পরিচিত ছিল একটি অনুন্নত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হিসেবে। যুদ্ধ-বিগ্রহে ক্ষতবিক্ষত এবং ভগ্নপ্রায় পুঁজিবাদী চীনকে সমাজতন্ত্রের আদর্শে গড়তে মাও উদ্যোগী হলেন। চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব সংগঠিত করার পাশাপাশি সামাজিক বিপ্লব ঘটানোরও চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে মাও ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নামের কর্মসূচি চালু করেন। কিন্তু তাঁর এই কর্মসূচি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।  ১৯৬৬ সালে অনেক কমিউনিস্ট নেতাকর্মীর বিরোধিতা সত্ত্বেও ‘কালচারাল রেভ্যুলুশন’ শুরু করেছিলেন। এর ফলে পার্টিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। মাওয়ের একগুঁয়েমির কারণে  গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড ও কালচারাল রেভ্যুলুশনে প্রায় এক কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।  সেই সঙ্গে সমগ্র চীনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। ব্যাপক ধস নেমেছিল অর্থনীতিতে।  
মাও প্রথম জীবনে বিশ্বাস করতেন— শহরের শিল্পকারখানার শ্রমিকরাই পার্টির বড় শক্তি।  কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিল্পকারখানার শ্রমিকরা নয়, গ্রামাঞ্চলের কৃষকেরাই পার্টির প্রাণ। তাই কৃষিজীবীদের প্রাধান্য দিয়ে তিনি পার্টি শাসনব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ করেছিলেন। মাওয়ের রাষ্ট্রনীতি চীনকে আমূল বদলে দিয়েছিল। তার যোগ্য নেতৃত্বের ফলেই সামন্তবাদী সমাজ থেকে চীন অতি অল্পসময়ে আধুনিক সমাজে পরিণত হয়। জীবদ্দশায় নিজের প্রণীত রাজনৈতিক দর্শন ও বিপ্লবীতত্ত্বের জন্য মাও সেতুং যেমন পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামী প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন, তেমনি নানা মহলের তীব্র সমালোচনারও সম্মুখীন হয়েছিলেন।  

লেখক: ব্যাংক নির্বাহী
[email protected]