Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সবুজ পৃথিবী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-09-09
মাটি-মানুষ আর প্রকৃতির কথা
গৌতম কুমার রায় : খনার জীবন কাহিনী নিয়ে অনেক কথা-প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। কারো কারো মতে ময়দানবের কন্যা ছিলেন খনা। রাক্ষসেরা খনার পরিবারের সকলকে হত্যা করলেও স্রেফ মায়ার কারণে খনাকে বাঁচিয়ে রেখে লালন-পালন করতে থাকে। ছোট বেলা থেকে ভবিষ্যত্ ঘটনা নিরূপণে খনার দক্ষতা দেখে রাক্ষসেরা তাকে জ্যোতির বিদ্যার শিক্ষা দেয়।     
উজ্জয়িনীর মহারাজ বিক্রমাদিত্যের সভার বরাহ পণ্ডিত পুত্র সন্তানের পিতা হন। জ্যোতিষ শাস্ত্র বিষারত বরাহ পণ্ডিত নিজের ছেলের আয়ু গণনাকালে শত বছরের স্থলে মাত্র দশ বছর গণনা করেন। শোকাগ্রস্ত পিতা ছেলের স্বল্প আয়ুর কথায় ব্যথিত হয়ে একদিন তার সদ্যজাত পুত্রকে একটি তাম্র নির্মিত পাত্রে ভরে সমুদ্র জলে ভাসিয়ে দেন। তাম্রপাত্রে সন্তানটি ভাসতে ভাসতে লঙ্কার উপকূলে পৌছে এবং একপর্যায়ে রাক্ষসদের হাতে পড়ে। রাক্ষসেরা খনার সাথে বরাহ পণ্ডিতের পুত্র মিহিরকে লালন-পালন করতে থাকে।
এদিকে ধীরে ধীরে খনার খ্যাতি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে রাক্ষসেরা খনার সাথে মিহিরের বিবাহ দেন। জানা যায় খনা তার শ্বশুর ও স্বামীর  মান অক্ষুণ্ন রাখতে, নিজেকে সংযত করতে নিজের জিহ্বা নিজেই কর্তন করেছিলেন। তবে আরেকটি তথ্যে জানা যায়, খনার জিহ্বা তার শ্বশুর বরাহ তা নিভৃত স্থানে রাখেন। খাবার মনে করে টিকটিকি তা খেয়ে ফেলে। যে জন্য সে সময় হতে টিকটিকির ডাকের  শব্দে ভুত-ভবিষ্যত্ গণনার প্রচলন শুরু হয়।
খনা তার বচনের মাধ্যমে  আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ কৃষির সময় অনুযায়ী বুনন ক্রিয়া, শুভযাত্রর লক্ষণ, হাঁচি ও টিকটিকির ফল, বৃষ্টি গণনা, পরমায়ু গণনা, বন্যা গণনা, মড়ক গণনা, দম্পত্তির অগ্রপশ্চাত্ ও চন্দ্র গ্রহণ গণনা করা হয়ে থাকে। এ থেকে প্রকৃতির রূপ, আবহাওয়ার গতি প্রকৃতির ধ্যান-বর্ণনার ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে আজকের জলবায়ুগত পরিবর্তন, পরিবেশের তাপমাত্রাগত পরিবর্তন, অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক আচারণ, জনজীবণে অস্বস্তি এতসবের আগাম এবং পদ্ধতিগত ছকবাঁধা ভবিষ্যত্ হিসাব-নিকাশের ধারা সৃষ্টি করেছেন খনা। যা কি না তার বচনের মাধ্যমে এখনও আমাদের কাছে স্পষ্ট উপস্থাপনা। এই বিষয়টিকে সামনে রেখে আমাদের ১৪১৭ বাংলা সালের ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা কুয়াশা, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, দুর্িভক্ষ, মড়ক, অতিবৃষ্টি ও বর্ষা গণনার যে ভবিষ্যত্ হিসাব পাওয়া যায় তা হলো—
পৌষে কুয়া বৈশাখে জল,
য’দিন কুয়া ত’দিন জল
অর্থাত্—পৌষ মাসে যতদিন কুয়াশা হয়, বৈশাখ মাসে ঠিক ততদিন বৃষ্টি হয়।
বছরের প্রথমে ঈশান বায়ু হবেই বর্ষা খনা কয়।
অর্থাত্—বছরের শুরুতে যদি ঈশান কোন থেকে বায়ু বইতে থাকে তবে, প্রবল বর্ষণের সম্ভাবনা থাকে।
পৌষে গরমী বৈশাখে জাড়া,
প্রথম আষাঢ়ে ভড়বে গাড়া।
অর্থাত্—যে বছরে পৌষে গরম এবং বৈশাখে ঠাণ্ডা পড়ে সে বছর প্রথম আষাঢ়ে প্রচুর বৃষ্টি হয়।
পুর্বেতে উঠিলে কাঁড়,
ডাঙ্গা ডোবা একাকার। অথবা—
চাঁদের সভার মধ্যে তারা,
বর্ষে পানি মুষলধারা।
অর্থাত্—চন্দ্রমণ্ডলের মধ্যে যদি তারা দেখা যায়, তবে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে।
চৈত্র কাঁপে থর থর, বৈশাখেতে ঝড় পাথর।
জৈষ্ঠ্যেতে তারা ফুটে, তবেই জানবে বর্ষা বটে।
অর্থাত্— যে বছরে চৈত্রমাসে শীত থাকে, বৈশাখে শিলা বৃষ্টি হয় ও জৈষ্ঠ্য মাসে আকাশ পরিষ্কার থাকে। সে বছরে প্রবল বর্ষণ হয়।
পশ্চিমে ধনু নিত্য খড়া,
পূর্বে ধনু বর্ষে ধরা।
অর্থাত্—পশ্চিম আকাশে রামধনু উঠলে খড়া হয় এবং পূর্ব আকাশে উঠলে প্রবল বৃষ্টি হয়।
খনার বচন বলে, যে বছর আম বেশি হয়, সে বছর ধানও বেশি জন্মে। আবার তেঁতুল যে বছর বেশি হয়, সে বছর বন্যা বেশি হয়। সময়মত বৃষ্টি হলে আমের মুকুল শুকায় না। এতে মাটি সরস হয়, গুটি শক্ত হয়ে গাছে থেকে যায়। দ্রুত মুকুল থেকে আম পর্যন্ত হয়। ধান এ সময় মাঠে থাকে বলে তা সরস মাটি পেয়ে সতেজ হয় এবং দ্রুত পাতা ছেড়ে ধান তৈরি হয়। সে জন্য বচনে বলা হয়েছে—
আমে ধান,
তেঁতুলে বান।
ব্রাহ্মণ যেমন দক্ষিণা পেলেই বিদায় হন, তেমনি বৃষ্টি ও বন্যা দক্ষিণা বাতাসে বিদায় হয়। যে জন্য বচনে বলা হয়েছে,
বামুন বাদল বান,
দক্ষিণা পেলেই যান।
যদি মাঘের শেষে বৃষ্টি হয়, তাহলে রবিশস্য বেশি হয়। বচনে তাই বলা হয়েছে,
“যদি  বর্ষে  মাঘের শেষ,
ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।”
আবার মাঘ মাসে বৃষ্টি হলে অনেক ফসল জন্মে তাতে কৃষক লাভবান হয়,
খনা এখানে বলেছেন—     
মাঘ মাসে  বর্ষা দেখা,
রাজা ছাড়ে প্রজার সেবা।  
বাঙালি সংস্কৃতির প্রাচীনতম সম্পদ “খনার বচন”। এই বচন এখনো মনে করিয়ে দেয়, আমাদের কৃষি ও কৃষ্টি বা সংস্কৃতির গবেষণামূলক ধারা কত প্রাচীন। এদেশের ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে বাঙালির জীবণধারা ও সংস্কৃতির যে উন্মেষ ঘটেছিল তার সমন্ময়ক ছিল খনার বচন। এদেশের চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে ধারাবাহিক যে গবেষণাধর্মী  উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল, তার সাক্ষ্য বহন করে আজো খনার বচন আমাদের আত্মিক মনোভাবের পরিচয় বহন করে আছে। এক সময়ে সৃষ্ট বচন, এদেশের মাটি, বায়ু ও আলোয় পুষ্টি লাভ করেছিল। খনার বচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এদেশের পরিকল্পিত চাষাবাদের গবেষণাময় অতীত রূপ। যা কি না অনেক আগ থেকেই বিজ্ঞান ভিত্তিক গবেষণার পরিচয় বহন করে।
খনার বচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এদেশের উর্বর মাটিতে এক সময় প্রচুর ফসল উত্পাদন হতো। তন্মধ্যে ধান ছিল অত্যাবশ্যকীয় এবং প্রধান ফসল। বিনা সারে প্রচুর ধানের ফলনের জন্য চাষিকে তেমন মাথা ঘামাতে হতো না। তবে, মাটি- জলবায়ুর প্রভাব, রোপণ ও কর্তনের সময়, গুণগতমান, ফলন পদ্ধতি প্রভৃতি সম্পর্কে মানুষকে চিন্তা করতে হতো। এই উত্পাদনমুখী নানান চিন্তা চেতনার সমন্বয়ক উপলদ্ধি ছিল খনার বচন। ধান চাষে বোরো এবং পাট চাষের জন্য খনার বচনের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার নেই বললেই চলে। তবে  বচন, আউশ ও আমন ধান চাষের পদ্ধতিগত প্রভাবে তৈরি। কেননা অতীতে আমন-আউশ ধান চাষে অভ্যস্ত ছিল। প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য উত্পাদনেও চাষি তুষ্ট থাকতো। তাই কতটুকু ধান বুনন করা হলো এবং কতটুকু ধান উত্পাদন হলো তা না ভেবে, ধান উত্পাদনের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশে তাল মিলিয়ে উত্পাদন পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। এই পদ্ধতির গবেষণার ধারাবাহিক সংরক্ষণ হলো খনার বচন।

(একে/সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৪)