Space For Rent

Space For Rent
মঙ্গলবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
প্রচ্ছদ » সবুজ পৃথিবী
  দেখেছেন :   আপলোড তারিখ : 2014-09-09
মাটির স্বাস্থ্য ও অনুকূল পরিবেশ
বকুল খান : মাটির স্বাস্থ্য বলতে মাটির পরিবেশে উদ্ভিদ জন্মানো উপযোগী কিনা তা বুঝানো হয়ে থাকে। অর্থাত্ মাটিতে উদ্ভিদ জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে ওই মাটির স্বাস্থ্য ভালো না হলে ওই মাটির স্বাস্থ্য খারাপ। মাটির স্বাস্থ্য ভালো বা খারাপ তা নির্ভর করে মাটি ব্যবস্থাপনার ওপর। মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলি বিবেচনা করে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে মাটিতে ফসল উত্পাদন, ভূমিকর্ষণ, পানি সেচ, সার প্রয়োগ, বালাইনাশকের ব্যবহারসহ বহুবিধ কার্যাদি সম্পন্ন করা হলে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। অন্যদিকে মাটিতে অপরিকল্পিতভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে এমন পদার্থের নিঃসরণসহ অসমহারে সার প্রয়োগ, কীটনাশক প্রয়োগ করা হলে মাটির স্বাস্থ্য খারাপ হবে এবং ফলন কম হবে।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: মাটির পরিবেশ দূষণমুক্ত রেখে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশ উপযোগী মানসম্মত ফসল উত্পাদনই মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার প্রধান লক্ষ্য।
উদ্দেশ্য : মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা। মাটি ও পানি দূষণমুক্ত রাখা। মাটির পরিবেশ ভালো রাখা। ফসলের অপুষ্টি দূর করা। ভূমি ক্ষয় রোধ করা। পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি পূরণ করা। পুষ্টি উপাদানের বিষাক্ততা দূর করা। মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখা ও উত্পাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ফসলের চাহিদামত পুষ্টির মজুদ বৃদ্ধি করে পুষ্টি উপাদান অপচয় রোধ করা। মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলি উন্নত করে রোগ জীবাণু মুক্ত রাখা। ফসলের ফলন ও উত্পাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে মাটিতে উত্পাদিত ফসলের গুণগত মান বৃদ্ধি করা।
মাটির স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার কারণ : মাটির স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার কতিপয় কারণ হলো: ভূমিক্ষয় এবং অপরিকল্পিতভাবে ভূমি চাষ। সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ না করে মাত্রাহীন কীটনাশক প্রয়োগ। মাত্রারিক্ত আগাছানাশক প্রয়োগ। ভূমির নিবিড় ব্যবহার। শিল্প বর্জ্য শোধন না করে ভূমিতে মজুদ, যা আগাছার বিস্তার। জৈব সারের ব্যবহার না করে পুষ্টি উপাদানের অপচয়। উদ্ভিদ কর্তৃক পুষ্টি অধিক শোষণ। মাটির অম্লমান নিয়ন্ত্রণ না করে অনুমোদনবিহীন চুন ব্যবহার করা। প্রয়োজন নয় এমন সার ব্যবহার করে ক্ষতিকর রোগজীবাণুর প্রাদুর্ভাব। গোবর জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করার ফলে জৈব পদার্থ কমে যাওয়া।
মাটির স্বাস্থ্য বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ : মাটির স্বাস্থ্য ফসল উত্পাদনের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। কিন্তু সুষ্ঠু মাটি ব্যবস্থাপনার অভাবে মাটির স্বাস্থ্য দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। ফলে একক পরিমাণ জমিতে ফসলের উত্পাদন আশানুরূপ হচ্ছে না। তাই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাবহুল উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মাটির স্বাস্থ্য বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের মাধ্যমে অধিক ফসল উত্পাদন একান্ত প্রয়োজন। মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব পদার্থ যোগ করা। ফসলের চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ। প্রতি বছর হেক্টর প্রতি ১০-১৫ টন জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। পানি সেচের মাধ্যমে জমিতে উপযুক্ত আর্দ্রতা বজায় রাখা প্রয়োজন। ভূমিক্ষয় রোধের সম্ভাব্য ব্যবস্থা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে বজায় রাখা জরুরি। অম্লমান নিয়ন্ত্রণের জন্য অধিক অম্লীয় মাটিতে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে ফসল চাষ। আগাছা দমন। সবুজ সার জাতীয় ফসলের চাষ। উপযুক্ত পদ্ধতি নির্বাচন করে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ভূমিকর্ষণ। মাটিতে জাবড়া প্রয়োগ করে জলাবদ্ধতার সম্ভাবনা থাকলে পানি নিষ্কাশন করতে হবে। অধিক লবনযুক্ত মাটিতে লবনমুক্ত পানি দ্বারা সেচ প্রদান। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ নির্মাণ। মাটিরস্বাস্থ্য রক্ষায় কতিপয় সুপারিশ। প্রতিটি উপজেলায় মৃত্তিকা পরীক্ষা গবেষণাগার স্থাপন। প্রতিটি কৃষককে “ঝড়রষ ঐবধষঃয ঈধত্ফ ” প্রদান। প্রতিটি কৃষককে তার জমির মাটির পরীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী সার ব্যবহারে উত্সাহিত করা। প্রতিটি কৃষি জমির মাটি পরীক্ষা ও সার সুপারিশ নিশ্চিত করণ একান্ত কাম্য। অনুমোদন বিহীন সার, চুন বা কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করা। মাটি পরীক্ষা ছাড়া সার ব্যবহারে কৃষকদেরকে নিরুত্সাহিত করতে হবে। “মাটি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান। সার ও কীটনাশকের ডিলারদের প্রশিক্ষণ প্রদান নিশ্চিত করা। প্রতি ইউনিয়নে কৃষি পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন। কৃষি জমি দূষণ করে এমন পদার্থের কৃষি জমিতে নিঃসরণ বন্ধ করা। “সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা”/ “সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা” কার্যক্রম জোরদার করা। কৃষি উপকরণাদির সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। যথোপযুক্ত সময়ে পরিমিত পরিমাণে পানি সেচ ও নিকাশের ব্যবস্থা করণ।
পরিবেশ রক্ষায় স্বাস্থ্যহীন মাটি সংশোধন: কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের ফসল জন্মানোর প্রাকৃতিক খাদ্য মাধ্যম মাটি। এ মাটিতে ফসলের বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকে যা গাছ গ্রহণ করে পুষ্টি যোগায়। তাই মাটির পরিবেশ রক্ষায় ফসল উত্পাদনে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ফসল উত্পাদনে স্বাস্থ্যবান ও অস্বাস্থ্যবান মাটি এক অন্যের বিপরীত। স্বাস্থ্যবান মাটিতে ফসল ভালো হয় এবং অস্বাস্থ্যবান মাটিতে ফসলের ফলন ভালো হয় না। অন্যদিকে মাটির উর্বরতার দিক বিবেচনা করলে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মাটিই অস্বাস্থ্যবান। ফলে ফসলের আশানুরূপ ফলন হয় না। সুতরাং ফসলের কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়ার জন্য অস্বাস্থ্যবান মাটিকে সংশোধন করে স্বাস্থ্যবান মাটিতে পরিণত করে মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হয়।
অস্বাস্থ্যবান মাটি (Unhealthy Soil): যে মাটিতে উদ্ভিদের অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকে এবং যা ফসল উত্পাদনের অনুপযুক্ত তাকে অস্বাস্থ্যবান / অউত্পাদনক্ষম মাটি বলে। এ মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকে, রোগজীবাণু থাকে, ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ অতিমাত্রায় বিদ্যমান থাকে, বাফার ক্ষমতা কম থাকে, জৈব পদার্থ কম থাকে, পুষ্টি উপাদানের অপচয় বেশি হয়, আর্দ্রতা কম থাকে, সর্বোপরি মাটির উর্বরতা কম থাকে। মাটি বিভিন্ন কারণে অস্বাস্থ্যবান হতে পারে, যেমন- অনুমোদনহীন রাসায়নিক সার    

ব্যবহার করা। বিনির্দেশ বহিভূর্ত চুন ব্যবহার করা। শস্য চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি। জৈব সার ব্যবহার না করা বা ব্যবহার কম করা। সুষম সার ব্যবহার না করা। কৃষি জমি শোধন না করা। বীজ শোধন না করে বপন। সঠিক পদ্ধতি ও পরিমিত পরিমাণে সেচ না দেয়া। কৃষি জমিতে শিল্প বর্জ্য নিঃসরণ করা। অপরিকল্পিতভাবে বালাইনাশক ব্যবহার করা। অপরিকল্পিতভাবে ভূমি চাষ। অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটান। সর্বোপরি ফসলের চাহিদামত পুষ্টির জোগান না দেয়া। মাটি স্বাস্থ্যহীন হলে—
ষ মাটির উর্বরতা ও উত্পাদনক্ষমতা কমে যায়। ষ মাটি ও পানি দূষণ হয়। ষ পুষ্টি উপাদানের বিষাক্ততা দেখা দিতে পারে। ষ মাটিতে ক্ষতিকর ভারী ধাতব পদার্থের আধিক্য হতে পারে। ষ ফসলে অপুষ্টিজনিত লক্ষণ দেখা যায়। ষ কৃষি ফসলের ফলন, উত্পাদন কমে যায়। ষ ফসলের গুণগত মান কমে যায়। ষ ফসলে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের আক্রমণ বেশি হতে পারে। ষ ফসল রোগাক্রান্ত হয়। ষ উপকারী অনুজীবের কার্যাবলী কমে যায়। ষ সর্বোপরি মোট দেশজ কৃষি উত্পাদন কমে। এসব আলোচনা হতে এটাই প্রমাণিত যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সুষম করার জন্য মাটির স্বাস্থ্য ভালো রেখে সীমিত জমি থেকে অধিক ফসল উত্পাদন করতে হবে।
অস্বাস্থ্যবান মাটি সংশোধন: অস্বাস্থ্যবান মাটি সংশোধনের উপায়সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— ষ সুষম সার ব্যবহার। ষ অনুমোদিত চুন দ্রব্য যেমন— ডলোচুন ব্যবহার। ষ মাটির উর্বরতা বিবেচনা করে ফসলের চাষ। ষ জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো। ষ অনুমোদিত রাসায়নিক সার ব্যবহার।
ষ মাটি শোধন করে জমি তৈরি। ষ বীজ শোধন বা রোগমুক্ত বীজ বপন। ষ সঠিক পদ্ধতি ও পরিমাণে সেচ দেয়া। ষ কৃষি জমিতে শিল্প বর্জ্য জমানো বন্ধ করা। ষ পরিকল্পিতভাবে বালাইনাশক ব্যবহার। ষ পুষ্টি উপাদানের অপচয় কমানো। ষ পরিকল্পিতভাবে জমি চাষ। ষ পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো ও কর্তন। ষ সর্বোপরি মাটি পরীক্ষা করে ফসলে চাহিদামত সার প্রয়োগ।
স্বাস্থ্যবান মাটি : যে মাটিতে উদ্ভিদের অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকে না এবং মাটি দূষণমুক্ত তাকে স্বাস্থ্যবান মাটি বলে।
মাটি স্বাস্থ্যবান হবে যদি— ষ মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি উপাদান মজুদ থাকে। ষ মাটির উর্বরতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় থাকে। ষ মাটিতে ফসলের চাহিদামত পুষ্টি উপাদান সহজলভ্য অবস্থায় থাকে। ষ মাটিতে রোগ জীবাণু না থাকে। ষ মাটি ও পানি দূষণমুক্ত থাকে। ষ মাটিতে পুষ্টি উপাদানের বিষাক্ততা না থাকা। ষ মাটিতে উপযুক্ত আর্দ্রতা থাকে। ষ সর্বোপরি মাটির পরিবেশ ভাল থাকে ।
স্বাস্থ্যবান মাটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য— ষ উর্বর ষ রোগজীবাণুমুক্ত ষ মাটি বিষাক্ত দ্রব্য মুক্ত ষ ক্ষতিকর ভারী ধাতুর অনুপস্থিতি ষ উপকারী অণুজীবের উপস্থিতি ষ পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় পরীক্ষা ও সুষম সার প্রয়োগ: কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের গ্রামীণ জনসাধারণের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ লোক কৃষির উপর প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাদের কায়িক পরিশ্রমেই এদেশের প্রায় ১৫ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য খাদ্য চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ বাড়তি খাদ্য চাহিদা পূরণে গোটা কৃষক সমাজ হিমসিম খাচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের আবাদি জমির পরিমাণ সীমিত। এ সীমিত জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনগণের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে হলে মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে পরিবেশ বজায় রেখে সুষম সার প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ করতে হবে।

(একে/সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৪)