বই পড়া ও উত্সবে আগ্রহ বাড়ুক
Published : Tuesday, 1 August, 2017 at 8:49 PM, Count : 143
বই পড়া ও উত্সবে আগ্রহ বাড়ুকলিয়াকত হোসেন খোকন : আজ ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে মোবাইল-কম্পিউটার-ল্যাপটপ। মোবাইলে ফেসবুক ব্যবহার করছে না এমন একজন তরুণ-তরুণী হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। এদের অনেকেই মোবাইলে দেখছে পর্নো ছবি নয়তো কেউ বন্ধু বান্ধবীর সঙ্গে করছে নানান রকম প্রতারণা। মোবাইল নিয়ে কেউ কেউ ভালো কাজে তা ব্যবহার করছেও না। পর্নো ছবি কেউবা আপলোড করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কেউবা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস উসকে দিচ্ছে। কেউবা করছে ধর্মের উপর আঘাত। মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতেও চেষ্টা   চালাচ্ছে কেউবা। কতিপয়ের ফেসবুকের জন্যই দেশে বাড়ছে ধর্ষণ, জঙ্গিবাদ, হত্যা ও নানান রকম অপরাধ।
বন্ধু কর্তৃক বন্ধু হচ্ছে খুন। বন্ধু’র প্রতি বন্ধু’র মায়া মমতা তাও যেন আজ অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। অথচ ৫০ বছর আগে অভিজাত বাঙালির ঘরে ঘরে ছিল রেডিও আর গ্রামোফোন। বুকসেলফে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি থাকতো রূপকথার, ভ্রমণের নয়তো গল্প-উপন্যাসের বই। কাছে পিঠে ছিলো পাঠাগার, সিনেমা হল, পার্ক, বিশাল মাঠ। স্কুল কলেজে জমিয়ে উদযাপিত হতো সাংস্কৃতিক উত্সব। নানান খেলায় মুখরিত থাকতো শহর-বন্দর। যে জন্য তখনকার তরুণ-তরুণীরা বই পড়ে ও উত্সবে অংশ নিয়ে সন্মুখে দেখেছে আদর্শের পথ। এসব হারিয়ে গেছে আজ । এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণী ও উঠতি বয়সের অনেকেই মোবাইলে ফেসবুক চালিয়ে কি আজ ভুল পথে কী পা বাড়াচ্ছে না? একদা স্কুল-কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন চলতো একটানা ৭ থেকে ১০ দিন ধরে। ঢাকার খ্যাতনামা শিল্পীরা মফস্বলে গিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন-তখন তো আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠতো গোটা শহর।
‘তুমি আজ কত দূরে,........ আঁঁখির আড়ালে চলে গেছো তবু রয়েছো হূদয় জুড়ে’ থেকে শুরু করে ‘প্রেম একবারই এসেছিলো নীরবে আমারই দুয়ার প্রান্তে’ এসব গান স্থানীয় শিল্পীরা দরদ দিয়ে গাইতেন। ক্ষমা দাস গুপ্তা যখন- ‘ভুল সবই ভুল এই জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা-সে ভুল’ গাইতেন তখন তো সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনতেন, দু’নয়ন ভরে দেখে নিতেন প্রিয় শিল্পীকে।  সেই ক্ষমাও আজ নেই, নেই কত শিল্পী-এখন আর শুনিনা করতালি, চিত্কার- ওয়ান মোর ওয়ান মোর...........। ‘আমার ও দেশের মাটির গন্ধে ভরিয়াছে সারাময়’ ; ‘মেঘবরণ কন্যা থাকে মেঘলামতির দেশে’ কিংবা ‘পৃথিবী আমারে চায় রেখোনা বেঁধে আমায় খুলে দাও প্রিয়া’ এ রকম কত গান সেদিন সবাইকে মন ভরিয়ে দিতো। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি খেলাধুলা, যেমন-ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, হাডুডুতে সরব হয়ে উঠতো স্কুল কলেজের মাঠ প্রাঙ্গণ।
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
আমরা আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম.... বাউল শিল্পী শাহ আবদুল করিমের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় এ গানটি সে কথা বেশি স্মরণ করিয়ে দেয়।
ধর্মীয় উত্সব-ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজা, শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী, মহরম, লক্ষ্মী পূজা, সরস্বতী পূজায় সে কি আনন্দ, ঘরে ঘরে বাজতো গ্রামোফোনে কত গান। স্বাধীনতা দিবসে ফুটানো হতো রংবেরয়ের আতস বাজি। কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কত স্লোগান, কত আনন্দ, কত মিছিল-মারামারি নয়, হানাহানি নয়, বুকেবুক মিলিয়ে মহব্বত। তবে কী ভোলা যায় পিরোজপুর কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে (১৯৭২) পান্তাডুবির সিদ্দিকের ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের সেই ঘটনা। সেই সিদ্দিকও নেই, নেই রফু-রুস্তুম-কুদ্দুস ভাইও। সেই দিনগুলিতে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা নানান রকম উত্সবে ছিল মাতোয়ারা। কিন্তু এখন দেখি কত স্কুল কলেজের সম্মুখে নেই খেলাধুলার মাঠ, হয় না তেমন কোন সাংস্কৃতিক উত্সব। যে জন্য এ যুগের তরুণ-তরুণীদের কতিপয় অংশ যেনো আজ ছুটছে ফেসবুক নিয়ে অন্ধকারের পথে।
মোবাইলে ফেসবুক নিয়ে রাত পার করে দিচ্ছে ওরা। সেখানে শুধুই যে পর্নো ও অশ্লীল ছবির ছড়াছড়ি। আমাদের যুগে সন্ধ্যার পরে পড়ার টেবিলে যাওয়া, রাত ১০টায় খাওয়া-দাওয়া শেষে বিছানায় শুয়ে পড়া। সকাল হতেই পড়াশুনা, সময়মত স্কুলে নয়তো কলেজে যাওয়া। বিকেলে খেলার মাঠে নয়তো পাঠাগারে গিয়ে পত্র-পত্রিকায় চোখ বুলাতাম আর মজা করে উপন্যাস পড়েছি। কখনওবা শরত্চন্দ্রের ‘দেবদাস’ পড়ে প্রমথেশ চন্দ্র বড়ুয়ার ‘দেবদাস’ ছবি দেখবার জন্য হা-হুতাশ করেছি। ‘শাপমুক্তি’ ছবিতে জুতা পালিশওয়ালা চোখের জল ফেলে যখন গাইতো- ‘একটি পয়সা দাও গো বাবু........ ময়লা জুতো পালিশ করে নাও বাবু’ তখন আমাদের দু’ চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তো।  হঠাত্ পথ চলতে গিয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে যদি বেজে উঠতো- ‘রুম ঝুম বরষে বদর আ..পিয়া ঘর আজা কালে কালে বাদল ঘির ঘির আগায়া..........’ গানখানি তখনতো পুরোটা না শুনে কিছুতেই পা আগাতে চাইতো না। কী করে ভুলি এই গানের কণ্ঠশিল্পী জোহরাবাঈ আম্বালওয়ালী এবং নায়িকা স্বর্ণলতাকে। তাদেরকে যথাক্রমে মুম্বাই ও লাহোরে গিয়ে কাছ থেকে  দেখার সেই স্মৃতি আজও আমায় পিছু টানে।
মফস্বল শহর পিরোজপুরে এক উত্সবে এলেন আঙুরবালা দেবী, উঁনি গাইলেন- ‘আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা আমি যে পথ চিনি না’। সেই গান, সেই দেখা মনে হলে এই পড়ন্ত বেলায় দেখতে পাই আঙুরবালার মুখখানা। আজ সে সব কোথায়! শৈশবের স্মৃতি বলেশ্বর নদীতে  নৌকা বাইচ ছিলো একটি দৃষ্টি নন্দন রোমাঞ্চকর দৃষ্টান্ত। জারি গান, পালা গান, যাত্রা এসবও হতো বেশ জাকজমক ভাবে। বাংলাদেশের চিত্রপট থেকে নানান রকম বিনোদন উত্সব, বই পড়া, গান শোনা, মাঠে খেলাধুলা করা ইত্যাদি দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। যে জন্য এ যুগের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে কেউ কেউ আজ হয়ে উঠছে বিপদগামী। কেউবা ইয়াবা সহ নানান মাদকে আসক্ত হচ্ছে, বন্ধুত্বের নামে বাড়ছে ধর্ষণসহ নানা অপরাধ। এ অবস্থায় তরুণ-তরুণীদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে তাদেরকে বই পড়ায় উত্সাহিত করে তোলার বিকল্প যে কিছু নেই।
বই পড়ার সঙ্গে জ্ঞানের সম্পর্ক অপরিসীম ষ বই পড়লে মানুষের জ্ঞানের দ্যুতি বাড়ে ষ আমাদের জীবসত্তা জাগ্রত থাকলেও মানবসত্তা জাগ্রত করার সিঁড়ি হচ্ছে বই। মানব সভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষের পাঠ অভ্যাসের তথ্য পাওয়া যায়। মানুষ বই পড়ে মনের খোরাকের জন্য, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এবং নিজেকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার জন্য। জ্ঞানের সূচনা বই থেকেই এবং সে জ্ঞানকে সামগ্রিকভাবে কাজে লাগানোর দক্ষতা মানুষ বই পড়ে পেয়ে থাকে। মানুষের মননশীল, চিন্তাশীল, সৃষ্টিশীল চিন্তার যাবতীয় সূচনার বিস্ফোরণ একমাত্র বইয়ের মাধ্যমে হতে পারে। বই পড়া এখন শুধুমাত্র অবসরের বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং এটি এখন আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।  যুগে যুগে মনীষীরা বই পড়ার গুরুত্ব মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। বই পড়লে আমাদের মস্তিষ্ক চিন্তা করার খোরাক পায়, সৃজনশীলতা বাড়ে এবং তথ্য ধরে রাখার ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। যেমন স্পিনোজা বলেন, ‘ভাল খাদ্য বস্তু পেট ভরে কিন্তু ভালো বই মানুষের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে।’ দেকার্তে বলেন, ‘ভাল বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলা।’ এ কথা মনে ধারণ করতে হবে- বই জ্ঞানের প্রতীক, বই আনন্দের প্রতীক। জ্ঞানরাজ্যের তৃপ্তি মেটানোর জন্য বইয়ের বিকল্প নেই।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘন ঘন উত্সবাদির আয়োজনও জরুরি। পাঠাগারে নিয়মিত যাতে তাদের উপস্থিতি থাকে এদিকেও নজরদারি বাড়াতে হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সাংষ্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয় তাদের দায়ও এড়াতে পারেন না বলে আমরা মনে করি।
লেখক: কলাম লেখক।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক: স্বপন কুমার সাহা।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft