রোহিঙ্গাদের কান্নায় বিশ্ববিবেক জাগবে কি?
Published : Monday, 11 September, 2017 at 9:40 PM, Count : 429
রোহিঙ্গাদের কান্নায় বিশ্ববিবেক জাগবে কি?মীর আবদুল আলীম : মানুষ হিসেবে আর মুসলমান হিসেবে রোহিঙ্গাদের ব্যথায় ব্যথিত হতেই হয়। সেদিন স্ত্রীকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের চিত্র দেখে কাঁদতে দেখলাম। তার সেই চোখের জলে তখনই আমি একটি কবিতা লিখে ফেললাম। আমার ফেসবুক ওয়ালেও আপ করলাম কবিতাটি। ব্যাপক সাড়া পেলাম। কবিতার শিরোণাম- ‘দাওনা প্রভু আমায় অন্ধ করে’ চোখ দু’টে বন্ধ করে/দাওনা আমায় অন্ধ করে,/ যেন দৃষ্টিতে না আসে/এমন নিষ্ঠুরতা।/হে প্রভু আমার অনুভূতি গুলো/দাওনা ভোতা করে,/যেন আমার মনের জানালায়/ওসব কষ্টগুলো/উঁকি-ঝুঁকি না মারে।/ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি/ভীষণ কষ্ট,/ সইতে যে পারি না আর/দাওনা প্রভু,/আমায় অন্ধ করে।’
এমন নিষ্ঠুরতায় আমরা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি। অন্ধ হতে মন চায়। এমন জুলুম নির্যাতনে স্বাভাবিকভাবেই মন খুব খারাপ হয়। কেবলই মনে প্রশ্ন জাগছে, মানুষের জীবন কি এতই ঠুনকো? জীবনের কি কোনোই মূল নেই? নিশ্চয়তা নেই? ঠিক-ঠিকানা নেই? আমাদের দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের যেভাবে নির্মম গণহত্যা, গণধর্ষণ, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়ে বসতবাড়ি থেকে বিতাড়নসহ বিভিন্ন ধরনের পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার করা হচ্ছে এমন নজির বিশ্বে খুব কমই আছে। বিগত কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ ইন করছে। রুটিনমাফিক নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করছে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে। বর্তমানে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত অবস্থায় বসবাস করছে। যদিও রিফিউজি হিসেবে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আরও কম। রোহিঙ্গাদের প্রতি যা করছে মিয়ানমার সরকার, তা সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধেই অপরাধ। এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আরাকানে বিকশিত হতে থাকা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সুবিধা না দেয়া, গ্যাটো সৃষ্টি করে সেখানে অমানবিক পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ করা, বিচারবর্হিভূতভাবে গ্রেফতার করা, মালিকানাস্বত্ব, সার্বজনীন শিক্ষা, চিকিত্সা, উপযোগ সেবা ও মৌলিক মানবাধিকার হতে বঞ্চিত করার মাধ্যমে নিমর্মতার শেষ সীমানাটুকু অতিক্রম করেছে মিয়ানমার সরকার।
 মিয়ানমার সরকার তার দেশের নাগরীকদের এভাবে নির্যাতন এবং অনদেশে চলে যেতে বাধ্য করতে পারে না। আসলে মিয়ানমারের মতলবটাই অনেকে বুঝে না। তারা রহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে পাঠাতেই সীমা লঙ্ঘন করে জুলুম, নিষ্ঠুরতা চালাচ্ছে। তারা চায় রহিঙ্গারা বাংলাদেশে চলে যাক। বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় তাই রহিঙ্গারা আমাদের দেশের না হলেও বিভিন্ন সময়ই সরকার মানবিক কারণে এদের আশ্রয় দিয়েছে, এবারও দিচ্ছে। অন্যদেশ হলে যুদ্ধে সামিল হতো মিয়ানমারের সঙ্গে। মিয়ানমার চরম সীমালঙ্ঘন করছে। তাদের দেশের নাগরিকদের আমাদের দেশে পাঠাতে যে নিষ্ঠুর নীতি তারা অবলম্বন করছে তা অন্যায় এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম পরিপন্থী। অথচ এমন নিষ্ঠুর পরিস্থিতিতেও বিশ্বে মিনমিনে প্রতিবাদ হচ্ছে। মোড়ল দেশগুলোর ভূমিকায় কি খুব খুশি হতে পারছি আমরা? তারা চাইলে তো বিশ্বে সবই হয়। তাদের চাওয়াটা নিখাদ কিনা তা-ই এখন প্রশ্নবিদ্ধ! আমরা উদ্বেগের সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো কোনো রাষ্ট্রের মাখামাখি লাখ করছি। মুসলিম নিধনে তাদের মৌন সম্মতি দেখে আমরা বিস্মিত ও হতবম্ব! বিশ্বের কথিত উন্নত সভ্যতার দেশ হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রগুলোকেও রহস্যজনভাবে নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। মুসলমান নিধন আর এমন জুলুম অত্যাচারের যারা প্রশ্রয় দিচ্ছে, সেসঙ্গে বাংলাদেশের মতো দেশে যারা অন্যদেশের নাগরিকদের চাপিয়ে বোঝা বাড়াতে নীরব ভূমিকা পালন করছে; ধিক্কার জানাই তাদের। রোহিঙ্গার ভারে বিব্রতকর অবস্থা হয়েছে বাংলাদেশের। ঘনবসতিপূর্ণ এদেশে ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। যাই হোক, এমন সময় আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে শ্রেষ্ঠ ধর্মের মানুষ আমরা। ‘জীবে দয়া কর’ তা ওদের (মিয়ানমারের বৌদ্ধ) ধর্ম পুস্তকে থাকলেও তারা তা মানছে কি? তাই বলে আমরা ওদের মতো উগ্রতা দেখাব না, উস্কানিও দেব না।
অনেকে এফবিতে বিভিন্ন কথা লিখে উস্কানি দিচ্ছেন। বাঙালি বাঙালিই। সে যে ধর্মেরই হউক তাদের প্রতি আমরা কিন্তু সদয় থাকব। সবশেষে মনে রাখবেন, কুকুরের কাজ কুকুরে করেছে...। মিয়ানমারে এমন বীভত্স হত্যাযজ্ঞ চালানোর ঘটনা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে না? মানবতাবাদী গৌতম বুদ্ধের অনুসারীরা ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ কিংবা ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ বলে যতই ধর্মবোধে লালিত হোক, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সঙ্কট নতুন নয়। সম্প্রতি দেশটিতে আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। চলছে সামরিক অভিযান। আর দমন নিপীড়নের শিকার হয়ে শত শত রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে চাইছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমসহ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা নির্যাতন এবং সীমানা অতিক্রম করে এদেশে ঢোকার ভয়াবহ চিত্র। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতন ও তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার বিষয়টি জনবহুল বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের।  মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সরকারি বাহিনীর নির্যাতন বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত এই জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি কমই পেয়েছে তারা। এটা অনস্বীকার্য যে, মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা কয়েক যুগ ধরেই বাংলাদেশে আসছে। বর্তমানে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে তথ্যে প্রকাশ। যা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের দেশে ফেরাতে জাতিসংঘের কার্যকর পদক্ষেপ চেয়েছেন। বরাবরই এমন সাহায্য চেয়ে আসছে বাংলদেশ। মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের মুখে পালিয়ে এসে কয়েক লাখ মানুষ গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। বাংলাদেশ তাদের ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে এলেও মায়ানমার তাতে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়াদের নাগরিক হিসেবেও মেনে নিতে নারাজ মিয়ানমার। গত ২৪ আগস্ট রাখাইনে পুলিশ পোস্ট ও সেনা ক্যাম্পে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার পর সীমান্তে নতুন করে মিয়ানমার নাগরিক এই রোহিঙ্গাদের ঢল নামে বাংলাদেশে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এই দফায় প্রায় এক লাখ ২৬ হাজার মানুষ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও বহু মানুষ শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা। এটা কি তাহলে মঘের মুল্লুক। মিয়ানমার কেন ওদের দেশের নাগরীকদের আমাদের দেশে আসতে বাধ্য করছে। রাখাইনরা কি বাংলাদেশের নাগরিক। তা না হলে জাতি সংঘ কি করছে। এমন একটি দুর্বল দেশে জাতিসংঘকে তোয়াক্কা করে না তা কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে?
মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে যুগযুগ ধরে বসবাস করে আসছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা। রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করছে দেশটির সরকার। তাদের হত্যা-ধর্ষণ, বাড়ি-ঘর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে । তাদের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চলছে তা আইয়ামে জাহেলীয়া যুগের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এসব তো দেখছে বিশ্ব নেতারা। কি করছেন তারা?  বিশ্ব মানবতাই বা কতটুকু সক্রিয়?
মিয়ানমার কাউকেই মানছে না- তা-ই দেখছি আমরা। দেশে দেশে যতই প্রতিবাদ হচ্ছে; যতই বলা হচ্ছে এই গণহত্যা থামাও’, ততই যেন রোহিঙ্গা মুসলিম নির্মূল চলছেই। নৃশংসতার মাত্রা বাড়ছেই।  গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ দেশ থেকে বিতাড়ন- সবই চালানো হচ্ছে রাখাইনে রোহিঙ্গদের উপর। এভাবে চলতে পারে না। বিশ্ব মুসলমানদের জাগতে হবে। আর ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না বিশ্ববাসীকে। সারাবিশ্বে এক সঙ্গে আওয়াজ তুলতে হবে। সেই সঙ্গে বিশ্ব বিকেকেও জাগ্রত হতে হবে, মিয়ানমারের ওপর এখনই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। মানুষ হত্যার নীতি, মানব নির্যাতন নীতি কোনো দেশেরই মেনে নেয়া ঠিক না। বিশ্ব নেতাদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, মিয়ানমারে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বন্ধে মিয়ানমার সরকারকে চাপ দিন। আমরা মনে করি এবং বিশ্বাস করি আপনাদের একটি ধমকেই এ নির্যাতন বন্ধ হতে বাধ্য। মনে রাখবেন ‘সবার ওপর মানুষ সত্য তাহার ওপর নাই।’ মানবজাতির ওপর চরম নির্যাতন হচ্ছে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। এ আঘাত কারও সওয়া ঠিক না। নিরীহ, অসহায়, নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলমানরা এমন নিষ্ঠুর বর্বরতা এখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। সাংবিধানিক, সামাজিক, মৌলিক অধিকার বা ভোটাধিকার দূরে থাক, নাগরিক অধিকারটুকুও নেই রোহিঙ্গা নামক জাতিসত্তার জন্মভূমি মিয়ানমারে।  তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে এমন বীভত্স হত্যাযজ্ঞের ঘটনা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে বৈকি! বিভিন্ন দেশে এর প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কিছুতেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না।
বংশ পরম্পরায় হাজার বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পর্যন্ত প্রদান করে না মিয়ানমার সরকার। এটা বার্মানীতি! মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা শব্দটি পর্যন্ত ব্যবহার করতে রাজি নয়। তারা এ সম্প্রদায়ের মানুষদের অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। তা তারা গায়ের জোরেই করতে চায়। বহু মানুষই মিয়ানমারে তাদের পূর্বপুরুষদের শিকড় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না মিয়ানমার সরকারের। তারা যা বলছে তাতেই বহাল থাকছে। আমার দীর্ঘদিন ধরেই দেখে আসছি, রোহিঙ্গা মুসলিমদের জাতিগতভাবে নির্মূলের চেষ্টা করছে মিয়ানমার। দেশটির নিরাপত্তাবাহিনী পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করছে এবং এদের নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করছে। এ সঙ্কট থেকে যেভাবে মোকাবিলা করছে সুচির সরকার তাতে দেশদেশে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, মিসরসহ বিভিন্ন দেশ। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, অর্ধশতাব্দী ধরে সামরিক স্বৈরশাসনের পর যখন মিয়ানমারে গণতন্ত্রায়নের সুবাতাস বইছে, গণতন্ত্রের সংগ্রামে নির্বাচিত দেশটির জনপ্রিয় নেত্রী অং সান সুচির দল নির্বাচনে জয়ী হয়েছে, সে সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বদলে আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। এ নির্যাতনে নোবেল পাওয়া সুচির অংশ গ্রহণের বিষয়টি কি প্রমাণ করে না? আমি বলব- তার চোখের সামনে যেভাবে হত্যা-নির্যতন চলছে, তা তার সমর্থন নিয়েই রোহিঙ্গা নিধন চলছে। আমরা মনে করি সুচি চাইলেই মিয়ানমারে সব হবে। রোহিঙ্গা নিধন প্রক্রিয়াও বন্ধ হবে।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সঙ্কট নতুন নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য যে, ১৭৮৪ সালে বর্মীদের আরাকান দখলের আগে সুদীর্ঘ ৩৫০ বছর পর্যন্ত আরাকান রোহিঙ্গা মুসলমান কর্তৃক শাসিত হয়েছে। অথচ তারা আজ নিজ দেশে পরবাসী। আরাকানসহ বার্মাকে মুসলিম শূন্য করার লক্ষ্যে ১৯৩৭ সাল থেকে যে নির্যাতন চলছে। তার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এমন ১৯৩৮ সালে সেন্ট্রাল বার্মায় ২০ হাজার মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় ব্রিটিশরা আরাকান ত্যাগ করলে এবং জাপান আরাকান দখলে নেয়ার আগে স্বল্প সময়ে আরাকানকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়া হয়। এ সময় কমপক্ষে এক লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান নিহত হয় এবং কয়েক লাখ দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। ১৯৪৮ সালে ‘এথনিক ক্লিনজিং
প্রোগ্রাম’-এর আওতায় প্রায় ৫০ হাজার জনকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে বলপূর্বক প্রেরণ করা হয়। ১৯৭০ সালে অবৈধ অভিবাসীকে চিহ্নিত করার নামে আরাকানে অনেকবার তলাশির নামে আরাকানি যুবক যুবতীদের চরমভাবে নির্যাতন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ড্রাগন অপারেশনের মাধ্যমে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা ও প্রায় ৩ লাখকে বাংলাদেশে বিতাড়ন করা হয়। ১৯৯১-৯৭ সালের মধ্যে প্রায় ২ লাখ মুসলিমকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়। ২০০৪ সাল নাগাদ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, বাংলাদেশে কমপক্ষে ১৫ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বসবাস করছে। বাংলাদেশ অনেক উদারতা দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু এর ফলে এ দেশে দীর্ঘমেয়াদি নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যেখানে কোনো লক্ষণই নেই, সেখানে বাংলাদেশ নতুন করে রোহিঙ্গা আশ্রয় দিয়ে নিজেই সমস্যা পড়বে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলে মিয়ানমারে রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার পরিকল্পনাই সফল হবে। মিয়ানমারের এ পরিকল্পনা সফল হতে দিলে বাংলাদেশের সমূহ ক্ষতির কারণ হবে। রহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি মানবিক এবং দেয়াও উচিত, দিচ্ছেও। আর এ সুযোগটিই নিচ্ছে মিয়ানমার সরকার। এইচআরডব্লিউ বলছে, বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণ করা ও তাদের সুরক্ষা দেয়া।’ এমন উচিতটা বুঝলেও এইচআরডব্লিউ মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধে সুস্পষ্ট কোনো
আহ্বান জানাননি বরং তারা তাদের ওয়েবসাইটে বলেছেন, মিয়ানমারে সহিংসতার অর্থ হলো বাড়ি ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। বিষয়টি মিয়ানমার সরকারের কর্মকা-কেই সমর্থন করে বৈকি। রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা উচিত ছিল। তা তারা করেনি। তাদের এমন মৌন সমর্থনের ফলে মিয়ানমার সরকারের বোধোদয় হবে না কখনোই। প্রশ্ন হলো, রোহিঙ্গাদের নিয়ে বর্তমান সঙ্কটের সমাধান কীভাবে হতে পারে? মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। অতীতে অনেক দেশেই এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর আগে ‘পরমাণু অস্ত্র নিয়ে জাতিসংঘ ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। সিরিয়া ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এখন মিয়ানমারের ওপর যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তাহলে সম্ভবত তাদের বোধোদয় হবে। নইলে হবে না। এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ কি আদৌ হবে? যদি না হয় বিশ্ব মুসলিমদেরই জাগতে হবে। সারাবিশ্বে আওয়াজ তুলতে হবে যাতে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। আর এটাই বোধ করি সঠিক সমাধানের পথ।
লেখক: কলাম লেখক।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক: স্বপন কুমার সাহা।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft