প্রসঙ্গ: সামাজিক সম্প্রীতি
Published : Wednesday, 8 November, 2017 at 9:26 PM, Count : 112
প্রসঙ্গ: সামাজিক সম্প্রীতিরায়হান আহমেদ তপাদার : পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে কমবেশি প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নৃশংসভাবে মানুষ খুন হচ্ছে। অবস্থাটা দিন দিন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, মনে হয় এ দেশে জীবনের কোনো মূল্যই নেই। মানুষরূপী জানোয়ারগুলো নিষ্ঠুর হয়ে গেছে, যেখানে দয়ামায়ার ন্যূনতম লেশটুকু পর্যন্ত নেই। নিভৃত পল্লীর শিশুসন্তানটি পর্যন্ত এখন আর নিরাপদ নয়। চলছে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। অনেক ক্ষেত্রেই এসব হত্যাকাণ্ডের কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। অনেকটাই বিচারহীনতার অবস্থা যেন ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। কারণ অপরাধকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে অপরাধপ্রবণতা বাড়বে বৈ কমবে না। তাছাড়া পৃথিবীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গে মানুষের অসম প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে দূরত্ব। ব্যক্তিজীবনে কমে আসছে ধৈর্যশীলতা। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা রাতারাতি বড়লোক হওয়ার লোভও বিরাজ করছে মাত্রাতিরিক্ত। দেশ, জাতি, সমাজ, পরিবার ক্রমেই ধাবিত হচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একজন মানুষের চরম নৈতিক মূল্যবোধের ধাক্কায় ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে আরেকজন মানুষের কোমল হূদয়। তৈরি হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়। এক কথায় দিন দিন মানুষের মানসিক বিকৃতি বাড়ছে। হতাশা বা অস্থিরতা বিরাজ করছে ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে বেঁচে থাকার প্রতিটি ধাপে। হূদয়ের মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে মানুষ পাশবিক হয়ে উঠছে। সামাজিক অবক্ষয় দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে। হেন কোনো অপরাধ নেই, যা সমাজে সংঘটিত হচ্ছে না। স্ত্রী স্বামীকে, স্বামী স্ত্রীকে, মা-বাবা নিজ সন্তানকে, ভাই ভাইকে অবলীলায় হত্যা করছে।
সমাজে সুষ্ঠু বিচার না পেয়ে বাবা-মেয়ে, মা-মেয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। প্রেমের কারণে অর্থ সম্পত্তির লোভে সমাজে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অন্যদিকে হতাশা নিঃসঙ্গতা বঞ্চনা অবিশ্বাস আর অপ্রাপ্তিতে সমাজে আত্মহননের ঘটনাও বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে ছেলে খুন করছে বাবা-মাকে, স্বামী খুন করছে স্ত্রীকে কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে। তাছাড়া অন্যের সম্পত্তি আত্মসাত্ করার জন্য কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দেবার নিমিত্তে নিজের সন্তানকে হত্যা পর্যন্ত করছে। আর যৌতুকের কারণে নির্যাতন ও হত্যা নিত্যদিনের ব্যাপার। কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে আগে তার সংস্কৃতি বিনাশ করে দাও।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভেতর দিয়ে একটি দেশ ও জনগণের নিজস্ব ইতিহাস, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ধরন উল্টাপাল্টা করে দেয়া হয় ও তার আত্মপরিচ্ছদকে অস্পষ্ট করে তোলা হয়। পরিণতিতে ওই দেশ বা জনগণের স্থির বিশ্বাস ও মূল্যবোধে চিড় ধরে এবং তারা এক দীর্ঘ হীনমন্যতার জালে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত একটা হীনমন্য জাতির নিয়তি হয় পরাধীনতা। আগের মতো স্বাধীনতা হরণ করার জন্য সব সময় সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেশ দখল করার নিয়মনীতি পুষতে অনেক পয়সাকড়ি লাগে। আবার সেই সামরিক আধিপত্য দীর্ঘদিন স্থায়ীও হয় না। এ কারণে আধিপত্য পাকাপোক্ত করতে প্রয়োজন হয় সাংস্কৃতিক দীক্ষার মাধ্যমে একজন হীনমন্যতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি, যারা আগ্রাসনকারীর কালচারকে লোভনীয় করে তোলে এবং উচ্চারণ করতে থাকে কথা বল ওদের ভাষায়, নকল কর ওদের, অস্বীকার কর নিজের সত্তা এবং সৃজনশীলতাকে। বর্তমান সভ্যতায় মুক্ত বাজার, মুক্ত আকাশ, মুক্ত মিডিয়া ও মুক্ত সংস্কৃতির নামে অনেক কর্মকাণ্ডই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 
যদিও মুক্ত শব্দটি শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু মানব জাতির দীর্ঘদিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মানুষ ভালো মন্দের মিশেলে এমন এক প্রাণী যাদের জন্য কিছু বিধিবিধান ও নিয়মশৃঙ্খলা খুবই আবশ্যক। নইলে মুক্ত শব্দটি হিতে বিপরীত হয়ে উঠতে পারে। আমাদের সন্তানদের উত্তম শিক্ষা দিতে হবে। তারা যাতে চরিত্রবান হয়ে সমাজে বেড়ে ওঠে আমাদের সে ব্যবস্থাই করতে হবে। অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, সামাজিক অবক্ষয় প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ফলে খুন-খারাবি, ছিনতাই, অপহরণের মতো ঘটনাও বাড়ছে সমান তালে। অপরদিকে পারিবারিক বন্ধন, স্নেহ-ভালোবাসা মায়া-মমতা আত্মার টান সবই যেন আজ স্বার্থ আর লোভের কাছে তুচ্ছ। শুধু তাই নয়, সমাজের উচ্চবিত্তের তরুণরা বিপথগামী হয়ে পড়েছে। তারা জড়িয়ে পড়ছে খুন, ধর্ষণ ও মাদকাসক্তসহ নানা অপরাধে। সমাজে এসব ঘটনাগুলো ঘটে মূলত ছোটখাটো স্বার্থের বিষয়ে, ছাড় দেয়ার মানসিকতা না থাকার কারণে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং পারিবারিক বন্ধন কমে গেলেও এগুলো ঘটে। আগে মানুষ বড় পরিবারে সবাই মিলে একসঙ্গে বসবাস করত, তবুও এসব সংঘাত কম হতো। এখন মানুষ ছোট ছোট পরিবারে ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু সামান্য কারণে প্রিয়জনকেও আক্রমণ করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক মূল্যবোধের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো পুনর্গঠনের দিকে জোর নজর দিতে হবে। কারণ সমাজের সব বিষয়ই একটার সঙ্গে অন্যটা সংযুক্ত। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অবনতি বা সুবিচার না হওয়ার কারণে কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা সাহসী হয়ে উঠতে পারে। এটা অপরাধ বৃদ্ধির কারণ। তবে অপরাধমুক্ত সমাজের জন্য সামাজিক মূলনীতিগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে হবে।
উল্লেখ্য যে সন্তানরা তাদের মা-বাবা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে কিংবা যে অভিভাবকরা তাদের সন্তান হত্যা করছেন, তাদের অনেকেই আর্থিক কারণে এ ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবকরা পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে পারিবারিক কলহ থেকে সন্তানকে হত্যা করছেন। এ ক্ষেত্রে অবৈধ সম্পর্ক চালিয়ে নিতে হত্যাকারী কোনো বাধা পেলেই ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। অনৈতিক লোভ, প্রতিযোগিতা, পরচর্চা ও পরকীয়ার কারণেই পারিবারিক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটছে। মূল কথা, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষ দিন দিন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছে। নিজের একক কর্তৃত্ব ও জিদকে প্রাধান্য দিয়ে প্রিয়জনকে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হচ্ছে। মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া বিষণ্নতা ও মাদকাসক্তি সমাজের এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডগুলোর জন্ম দিচ্ছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মকে। তাই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার তথা সমাজপতিদের এগিয়ে আসতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মূলত ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের আগ্রাসন সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। যে যেখানে যেভাবে পারছে, সে সেখানেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে। চলছে বিত্ত-বৈভবে বড় হওয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা। যেখানে নীতি নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। চাই শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। আর ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থা মানুষকে এভাবে চলার শিক্ষাই দেয়। ফলে প্রতিনিয়তই মানুষ অনৈতিকতার পথ ধরে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। ফলে শুধু ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটই নয়, পারলে মরণঘাতী মাদকের অনৈতিক ব্যবসা দেদার চালিয়ে যাচ্ছে। যার বলি হচ্ছে দেশের তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে যে কোনো বয়সের মানুষ। অর্থাত্ সামাজিক অবক্ষয় এমন রূপ নিয়েছে যেখানে পারিবারিক সম্প্রীতি পর্যন্ত এখন হুমকির মুখে।
অথচ প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যখন সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন এর মাত্রা কমার বদলে শুধুই বাড়ে। আমরা এখন ভয়ানক এক পরিস্থিতির মুখোমুখি। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে দল মত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষকে যেমন ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, তেমনি সব ধরনের অনৈতিকতা থেকে নিজেদের সরে আসতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা সম্ভব হবে না। 
অতীতে ছিল আমি, তুমি, সে, আমরা, তাহারা, একত্রে আমরা সবাই। আর বর্তমানে সব আমার, সব আমি, বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার। তাছাড়া পারস্পরি ক শ্রদ্ধাবোধের বালাই নেই সমাজের কোথাও এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটিও দখল করে নিয়েছে ঈর্ষা আর স্বার্থের দ্বন্দ্ব যা আনন্দঘন একটি পরিবেশকেও করে তুলেছে রণক্ষেত্র। এ ক্ষেত্রেও সন্তানরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অসুস্থ পারিবারিক পরিবেশে সন্তান অস্বাভাবিক মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে শিক্ষকের ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, সুশাসনের অভাব, পারস্পরিক দূরত্ব বৃদ্ধি, দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, সমাজে পেশিশক্তির প্রভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সর্বোপরি লাগামহীন অশ্লীলতাই আজকের তরুণ সমাজকে চরম অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সর্বগ্রাসী সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। এটা সবারই মনে রাখা উচিত যে, সামাজিক সমস্যা দূর করতে রাষ্ট্রের সহযোগিতার হয়তো প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু মূল দায়িত্বটি পরিবার তথা সমাজকেই নিতে হয়। সন্তানকে সময় দিন। তাকে বুঝতে চেষ্টা করুন। তার বন্ধুদের জানুন। তাকে নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিন। 
লেখক: যুক্তরাজ্যপ্রবাসী


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft