আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
Published : Monday, 20 November, 2017 at 9:20 PM, Count : 556
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতামমীর আবদুল আলীম : ‘ধান-চালের দরে বিশাল ফারাক’, আজকের (১৮ নভেম্বরের) পত্রিকার শিরোনাম দেখে ভাবি এ দেশে ফারাক নেই কোথায়? রাজনীতিতে, এক দলে আরেক দলে ফারাক, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে ফারাক, সামাজিক বন্ধনে ফারাক, মায়া মমতায় ফারাক, ভ্রাতৃত্ব, মাতৃত্ব, পিতৃত্বের বন্ধনে এখন বিস্তর ফারাক। এই ফারাক দেখেইতো শিল্পীরা গায়- ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’। সত্যিই আমরা আগে (ছোটবেলায়) অনেক সুন্দর দিন কাটিয়েছি। সেই দিন আজ কোথায়?
রাজনীতিতে ফারাক: রাজনীতিতে একদলের সঙ্গে আরেক দলের ফারাক থাকাটাই স্বাভাবিক। অস্বভাবিক হলেইতো বিপদ। এমনটাইতো এখন হচ্ছে। এখন দলাদলির ফারাকটা কিন্তু অনেক বেড়েছে। আগে কিন্তু এমনটা ছিল না। এক দলের লোক আরেক দলের দাওয়াতে গিয়ে আনন্দে সামিল হতেন। আড্ডা দিতেন চায়ের টেবিলে। এখন দুই দলের টেবিল আলাদা। কোথাও কোথাও বিয়ে বাড়িতে যার যার প্যান্ডেলও নাকি আলাদা হয়। দলদারী যারা করেন তাদের বিরোধীদের সঙ্গে রীতিমত মুখ চাওয়াচায়িও হারাম কোথাও কোথাও। তাহলে দলাদলিতে, মার্কায় মার্কায় ফারাকটা কত এটাই ভাবুন পাঠক!
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ফারাক: এই ফারাকটা ভয়াবহ! জাতির জন্য অসহনীয়। আগে শিক্ষক ছিলেন বাবার মতো। এখন শিক্ষকতো কখনো কখনো অর্থে কেনা কর্মচারী। এমন ভাবনা অনেক শিক্ষার্থীর মাঝে। আর বাবা যদি ম্যানেজিং কমিটির কেউ হন তাহলে শিক্ষকদের ক্ষেত্রভেদে হয়তো ওই মর্যাদাটাও আর থাকে না। ফেল করে ক্লাস টপকাতে না পারলে শিক্ষক বেচারার চাকরিটাই তখন খোয়া যায়। এই হচ্ছে আজকের শিক্ষকদের মর্যাদা! এদিকে অনেক শিক্ষকই আজ আগের শিক্ষকের মতো শিক্ষক নন। প্রফেশনাল শিক্ষক। তারা টিউশনি আর টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। তাই শিক্ষার্থীরাও তাদের দেখেন সেই দৃষ্টিতেই। বলতে হয় ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক সেই আগের জায়গায় নেই। শিক্ষকরা এখন শিক্ষার্থীদের শাসন করতে যায় না। এটা রাষ্ট্রীয়ভাবে মানা। আমাদের শিক্ষকরা আমাদের যেভাবে শাসন করেছেন, এমন শাসন করলে আজকের শিক্ষকরাতো নাজেহাল হবেন! আমার মনে আছে, ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন। সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাবার পথে স্যারকে (শিক্ষক) দেখে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে জংলায় পড়ে পায়ের হাড় ভেঙেছিলাম। এখনও প্রবীণ বয়সী শিক্ষকদের দেখলে শরীরে কাঁপুনি ওঠে। এখনকার ছাত্ররা শিক্ষকদের শাসনকে বাড়াবাড়ি ভাবে। উল্টো ছাত্ররাই শিক্ষকদের ধমক দেয়। মাঝে মধ্যে পত্রিকায় শিক্ষকদের গায়ে চড় থাপ্পর, কিল ঘুষি আর জীবন কেড়ে নেয়ার খবর পাই। গোবেচারা শিক্ষকরা অসহায় অনেক ক্ষেত্রেই। ছাত্ররা সুযোগ পেলে বলে স্যার বেত্রাঘাত করেছেন। অমনি ওই শিক্ষক মশায়ের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা। ছাত্র শিক্ষককে ডরাবে কি, শিক্ষকদেরই ছাত্রদের ভয়ে বুক দুরু দুরু থাকে। এ জায়গাতে ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্কের বিস্তর ফারাক হয়েছে। এ ফারাক দূর করা দরকার, তা না হলে জাতির অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে।
সামাজিক বন্ধনে ফারাক: ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’। আগের সেই দিন আছে কি? আমগাছ তলায় আম পেড়ে, পাড়ার লোকশুদ্ধ ভর্তা বানিয়ে খাওয়া; মায়ের হাতের চাল ভাজা, সিম বিচি খেয়ে বিকেল পার করা, আর কত কিছুই না ছিল। দুপুর না গড়তেই গাঁয়ের মাঠে ছেলে-বুড়া সবাই মিলে গ্রামীণ খেলায় মত্ত হতাম। সেই দিন কোথায় আজ? আমার দুটো ছেলের কথা বলি। ওরা সকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছোটে। দিন ধরে কোচিং করতে করতে সন্ধ্যা। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর প্রতিবেশীর সময় নেবার সময় কোথায়? আমি যে ফ্ল্যাটে থাকি সে বিল্ডিংয়ে ১৬৮টি বড়সর ফ্ল্যাটে প্রায় ১৪শ’ লেকের বাস। একটি বড় গ্রাম আরকি। গুনে গুনে ৭/৮ জনের নাম জানি। ছেলেরা তাও জানে কি-না সন্দেহ। বছরখানেক আগে আমার পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রমহিলার অকাল মৃত্যু হয়েছে। যে রাতে তিনি মারা গেছেন, আমার পরিবারের কেউ জানেন না সে খবর। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে লিফটের পাশে মানুষের সমাগম থেকে পরে বিষয়টি জানতে পারলাম। এইতো শহুরে জীবন। আর আমরা আগে কি দেখেছি? ২/১ দিন গাঁয়ের কারো সঙ্গে দেখা নেইতো মন আনচান করতো। এখন কেউ কারো খোঁজ রাখে না। সে সময় কোথায় হারিয়ে গেল? বড্ড ব্যস্ত আমরা। নিজেদের নিয়েই ব্যস্ততা বেশি। সামাজিক বন্ধনের ফারাকটা বুঝলেনতো পাঠক?
মাতৃত্ব-পিতৃত্ব-ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে ফারাক: বাস্তব ঘটনা। পত্রিকায় খবর হয়েছে। ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার পিতা মারা গেছেন বৃদ্ধাশ্রমে। পুত্রকে বাবার মারা যাবার খবরটা দেয়া হলে তিনি জানালেন- ‘আমি এখন মিটিংয়ে আছি। লাশ আঞ্জুমানে দিয়ে দিন’। হায় পুত্র! ঠাকুরগাঁয়ে এক মায়ের ঘটনা সবাই জানেন। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। ডিসি সাহেব গিয়ে পুত্রের নির্যাতনের শিকার মাকে এনে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ছেলেকে দেন হাজতে। মাতো জ্ঞান ফিরে একই প্রলাপ- ‘আমার ছেলে কোথায়? তোমরা তাকে মেরো না’। এমন হাজারো উদাহরণ আছে আমাদের ঘুণে ধরা এ সমাজের। মা-বাবার প্রতি সন্তানের মায়া-মমতার ফারাক কিন্তু এখন বেশ লক্ষণীয়। ভাই ভাইকে টাকার জন্য, জমির জন্য খুন করছে। ভাইয়ে ভাইয়ে ফারাক বেড়েছে। ভ্রাতৃত্বের, মাতৃত্বের, পিতৃত্বের বন্ধনে চিড় ধরেছে। এ চির জোড়া লাগানো না গেলে আমাদের যে আর অবশিষ্ট কিছু থাকে না।
ধর্মীয় বন্ধনের ফারাক: এ দেশে ইসলাম ধর্মের পর হিন্দু ধর্মাবলম্বীই বেশি। আমাদের যারা হিন্দু বন্ধু-বান্ধব ছিল তাদের সঙ্গে খুব ভাব ছিল আমাদের। প্রশান্ত নামের এক কলেজ বন্ধুতো বাসায় আমার মায়ের হাতের খাবার খেতো। আমরাও হিন্দু বাড়িতে গিয়ে লাড়ু, লাবড়া, লুচি খেয়ে আনন্দ করতাম। আর সেই আমরাই নানা ছুতোয় হিন্দু বাড়ি পুঁড়িয়ে দেই। দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনা। গত ২৮ অক্টোবর রংপুরের গঙ্গাচরে টিটো রায় নামের এক ব্যক্তি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে নাকি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। এমন কথিত অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তার অপরাধের শাস্তি আইন অনুযায়ী হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা কেন? আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতা ও অধৈর্যের প্রকাশ ঘটছে। এ ধরনের সহিংসতা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশের মানুষের মাঝে হতাশার সৃষ্টি করেছে। হিন্দু বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার এ ঘটনা সরকার কিংবা দেশের মুসলিম সম্প্রদায় ভালো দৃষ্টিতে নেয়নি। কোনো ব্যক্তিবিশেষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের খেসারত কেন জাতি দেবে? কেউ কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে কোনো কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে। টিটো রায় ভুল করতে পারে; মানুষও খুন করতে পারে। এটাতো টিটো রায়ের অপরাধ। এটাতো গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের অপরাধ নয়। তাহলে এতগুলো হিন্দু বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হলো কেন? মানুষগুলো সহায়-সম্বল হারাবে, তাও আবার বিনা দোষে, এটা কেমন কথা? এতকিছুর পরও কিন্তু আমরা একটি বিষয় খুব লক্ষ্য করেছি। হিন্দু মন্দিরে ও বাড়িঘরে যখন হামলা চলছিল, তখন তাদের রক্ষার জন্য স্থানীয় অনেক মুসলিম এগিয়ে এসেছেন, প্রতিরোধ গড়েছেন, এমনকি হামলাকারীদের হাতে আহতও হয়েছেন। এটাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের ভালোবাসার ফল। আমরা বাঙালি, এটাই হোক আমাদের পরিচয়। এ দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ হোক, আমাদের মানসিকতা বদলে যাক চিরতরে, এটাই প্রত্যাশা।
ধান-চালে দামের ফারাক: শুরুতেই ‘ধান-চালের দরে বিশাল ফারাক’ পত্রিকার শিরোনাম দিয়ে লেখা আরম্ভ করেছিলাম। এখন এ প্রসঙ্গে আশা যাক। এ দেশে দ্রব্যমূল্যের ফারাকটা নতুন নয়। পাইকারি বাজারে শসার দাম ২০ টাকাতো খুচরা বাজারে এর দাম ৫০ টাকা। কোনো কিছুতেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই যে যার মতো দাম হাকে; লাভ গোনে নিজেদের মতো করে। দেশে এখন চালের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। সিন্ডিকেটওয়ালারা চাল বেঁচে টাকার পাহাড় গড়ছে। বাজারে নতুন ধান উঠেছে। চালের দাম কমছে না। আবার কৃষকরা ধানের দামও পাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত ধানের মূল্যের সঙ্গে বর্তমান বাজারে বিক্রিত চালের দরের বিশাল ফারাক থাকায় বোরোর পর এবার আমন সংগ্রহ অভিযানও ব্যর্থ হওয়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ফের হুমকির মুখে পড়বে।
পাশাপাশি ভরা মৌসুমেও চালের দর আগের মতোই চড়া থাকবে বলে বাজার-সংশ্লিষ্ট অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গত ১২ নভেম্বর খাদ্য অধিদফতর প্রতি টন ধানের মূল্য ২৬ হাজার ৬৭ টাকা ৫৬ পয়সা ঘোষণা করেছে। অথচ টিসিবির মূল্যতালিকা অনুযায়ী ওই দিন বাজারে মোটা চাল (স্বর্ণা-চায়না ইরি) প্রতি কেজি ৪২ থেকে ৪৬ টাকা, পাইজাম-লতা ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারি মানের চাল ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা, নাজির-মিনিকেট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং সরু চাল ৫৮ টাকা ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। মিল মালিকদের মতে, এক মণ ধানে সর্বোচ্চ ২৭ কেজি চাল পাওয়া যায়। সে হিসেবে সরকার নির্ধারিত ধানের দর অনুযায়ী প্রতি কেজি চালের দাম হবে ৩৮ টাকা।
অথচ বাজারে এ দামে সর্বনিম্ন মানের চালও নেই। ধান চালের দামে এমন ফারাক হবে কেন? আর স্বাভাবিকভাবেই কৃষকরা এমন দামের ফারাক রেখে কেউ সরকারের কাছে ধান বিক্রি করবে বলে মনে হয় না। এদেশে অনেক কিছুতেই ফারাক বেশ চোখে পড়ার মতো। এ দূরত্ব, এ অসঙ্গতি কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে, সরকারকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এভাবে চললে মানুষ আর মানুষ থাকে না, দেশ আর দেশ থাকবে না। আসুন আমরা আমাদের সমাজে, পরিবারের, রাষ্ট্রের ফারাগুলো কমিয়ে আনি। আর তাতেই দেশের মানুষ ভালো থাকবে, দেশ সমৃদ্ধশালী হবে, সুন্দর দেশ হবে বাংলাদেশ। সেই দিনের প্রত্যশায় রইলাম আমরা।

লেখক: কলামিস্ট। 


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft