শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাঝে বিদায় নিলেন মেয়র আনিসুল হক
Published : Sunday, 3 December, 2017 at 8:47 PM, Count : 117

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাঝে বিদায় নিলেন মেয়র আনিসুল হকধীরাজ কুমার নাথ : বহুমুখী প্রতিভার এক মহান ব্যক্তিত্ব প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক সমাহিত হলেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাঝে। সমগ্র দেশবাসী শ্রদ্ধায় ও শোকে মুহ্যমান। দেশবাসী হারালো এক বরেণ্য সন্তানকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন হারালো তাদের প্রথম নির্বাচিত মেয়রকে এবং একজন দক্ষ প্রশাসককে, পরিবার হারালে আপনজনকে এবং রাজনৈতিক দল হারালো একজন চিন্তাশীল নেতাকে।

বৃহস্পতিবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৭ রাত ১০.২৩ মিনিটে তার মহাপ্রয়ানের খবর ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেশে, দেশের সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের দা ওয়েলিংটন হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অনেকে আশা করেছিল এমন নামজাদা, অভিজ্ঞ ও দক্ষ চিকিত্সকদের তত্ত্বাবধানে থেকে তিনি অবশ্যই সুস্থ হয়ে দেশে ফিরবেন। কিন্তু বিধিবাম, সব আশা সব সময় সফল হয় না। কিছুদিন আগেও তার সুস্থ হওয়ার খবরটি ছিল গণমাধ্যমে সোচ্চার। এই বছরই ২৯ জুলাই তিনি গিয়েছিলেন ব্যাক্তিগত সফরে লন্ডনে। দেশে ফেরার প্রস্তুতিকালে তিনি ১৩ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর কাটিয়ে উঠতে পারলেন না মহাবিপদ। নিয়তির লিখন অখণ্ডনীয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর নোয়াখালী জিলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি নোয়াখালী গেলে তাকে বিশাল গণসংবধর্না দেয়া হয়। সভায় জন সমুদ্র দেখে তিনি অভিভূত হয়েছিলেন।

দেশের সকল স্তরের জনগণ প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে সর্বত্র। তিনি একাধারে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট টিভি উপস্থাপক, একজন বিশিষ্ঠ শিল্প উদ্যোক্তা, কঠোর পরিশ্রমী ও অনবদ্য রাজনৈতিক নেতা এবং সর্বোপরি একজন দক্ষ প্রশাসক। এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেনি। এমন কোনো ব্যক্তি নেই যিনি তার সান্নিধ্যে এসে বিমোহিত হননি এবং তার চিন্তা ও মননশীলতা দেখে বিমুগ্ধ হননি।

আমার সুযোগ হয়েছিল কয়েকবার মেয়র আনিসুল হকের অতি নিকটে যাওয়ার, কথা বলার এবং উন্নয়ন ও প্রশাসনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করার। গত বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র অফিসে গিয়েছিলাম এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে। বিষয় ছিল নগরের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা। আমি কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, আপনি সবুজ শহর, পরিচ্ছন্ন শহর আর নিরাপদ নগর নিয়ে অনেক কাজ করছেন, ভাবছেন এবং নগর কর্তৃপক্ষের অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন।

কিন্তু হেলদি সিটি এই ধ্যান ধারণাই মনে হয় নগর পিতাদের মনে স্থান দিচ্ছেন না। অথচ নগরের ভাবনা বিকশিত হয়েছিল পয়ো নিষ্কাশন, কঠিন আর্বজনা ও ময়লার সুব্যবস্থা করা, মশক নিধন, শব্দ দুষন প্রতিরোধ এবং বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে।

সব মিলে মিশে হেলদি সিটি গড়ে তোলাই হচ্ছে নগরের বড় বিষয়, যা আদিকাল থেকে সভ্যতার নির্দশন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। মহোনজোড়ারো ও হরোপ্পা নগরীর প্রাচীন ইতিহাস ও সভ্যতা তারই স্বাক্ষর বহন করে। তিনি অম্লান বদনে স্বীকার করলেন, হেলদি সিটির ধারণা নগর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রাধিকার পায়নি কারন একাজ দৃশ্যমান নয়। আমরা তাই করছি যা লোকে দেখে বলবে কাজ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, আমাদের যে রাজস্ব আয় তা দিয়ে খরছের ৬০ শতাংশও আমরা যোগান দিতে পারি না। সরকারের নিকট থেকে থোক বরাদ্দ চাইতে হয়। এখানে স্বাস্থ্যসেবার প্রদানের পরিকল্পনা উপস্থাপন করা কঠিন, যেখানে বড় বড় হাসপাতাল বিরাজ করছে, স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব বহন করছে। কিন্তু যদি বস্তিবাসীর স্বাস্থ্যসেবা গ্রহনের বা প্রাপ্তির অক্ষমতার কথা বলি তবে অনেক সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলবেন বস্তি তুলে দাও। কিন্তু এই গরীব লোকেরা শহরের অংশ, শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ। আমাদের হচ্ছে শ্যাম রাখি না, কুল রাখি এমন অবস্থা। সিটি করপোরেশনের কাজের পরিধি বিশাল, একশতের উপরের দায়িত্ব দিয়েছে আইন। কিন্তু উপার্জনের ক্ষেত্র হচ্ছে প্রধানত হোল্ডিং ট্যাক্স এবং অন্যান্য কর আদায়ের ক্ষেত্র মিলে মাত্র ২৫টি। আমরা বুঝতে পারলাম তিনি সত্যিই বাস্তবের উপর নির্ভর করে কথা বলেন, তথ্যভিত্তিক ভাবনায় বিকশিত তার মন, যা তাকে দূরদর্শী হতে সহায়তা করেছে।

মেয়র হিসাবে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালের সামনের সড়ক দখলমুক্ত করতে গিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের তোপের মুখে পড়লেও তিনি থেমে যাননি। তিনি বেদখল হওয়া এই সড়ক জনগণের জন্য খুলে দিয়েছেন সব ধরনের বিরোধের অবসান ঘটিয়ে। এছাড়াও গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকায় বিশেষ রঙের রিকশা এবং ঢাকা চাকা নামে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সেবা চালু করেন। সবই প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডের নিদর্শন। এছাড়াও তিনি বিমান বন্দর সড়কে যানজট হ্রাস করার লক্ষ্যে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে ইউলুপ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং মহাখালী থেকে উত্তরা অবধি ১১টি ইউটার্ন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মহানগরীতে সরকারের অনেক দফতর, কর্তৃপক্ষ ও সংগঠন কাজ করে কিন্তু তিনি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এমন নেতৃত্বদান করেছেন যা সত্যিই বিরল ঘটনা এবং অসামান্য দৃষ্টান্ত। তাই মেয়র আনিসুল হক অনেক দিন মানুষের মনে একজন উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হিসেবে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

প্রয়াত আনিসুল হক একজন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে দেশের তৈরি পোষাক শিল্পে, জ্বালানি খাতে, তথ্য প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের সঙ্গে শুধু জড়িত ছিলেন তাই নয়, এসব খাতে এবং কর্মকাণ্ডে তিনি নিত্যনতুন দিগন্তের সুচনা করেছিলেন। তিনি তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালে নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন।

এছাড়া ও তিনি ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল অবধি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন সার্কভুক্ত দেশসমুহের ব্যবসায়ীদের সংগঠন সার্ক চেম্বার অব কর্মাসের সভাপতি। এ দায়িত্ব তিনি পালন করেন ২০১০ থেকে ২০১২ অবধি এবং সব সার্কভুক্ত দেশসমূহের শ্রদ্ধার আসনে আসীন ছিলেন এবং তিনি এই গৌরব অর্জন করেছেন নিজের দক্ষতা, মেধা ও দুরদর্শিতার ফলশ্রুতি হিসেবে।

এমন সব উদাহরণ দিতে হলো কারণ মেয়র আনিসুল হক ছিলেন বাস্তবধর্মী একজন প্রশাসক।

তিনি তার চিন্তায় ও চেতনায় ছিলেন গণমুখী। তিনি ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র নির্বাচনের পর থেকে শহরবাসীর সঙ্গে ছোট বড় সভায় মিলিত হয়ে তাদের চাহিদা এবং ভাবনা ও পরামর্শ সব সময়ই গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সবার কাছের মানুষ এবং সত্যিকারের জনপ্রতিনিরি স্বাক্ষর রেখেছেন প্রতি পদে পদে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাদের নিজের মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন যা একটি বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনের পর মেয়র আনিসুল হক কোন দলের প্রার্থী হিসাবে জয়লাভ করেছেন ভোটারেরা ভুলেই গিয়েছিল। তিনি সবার কাছে তাদের প্রিয় মেয়র হিসেবে আবির্ভূত হয়ে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছেন। এখানেই প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের রাজনীতির স্বার্থকতা। এই হয়ে থাক সকল জন প্রতিনিধিদের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

লেখক : সাবেক সচিব



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft