স্বপ্নসারথি আনিসুল হক: কর্মবীরের প্রয়াণ
Published : Monday, 4 December, 2017 at 8:37 PM, Update: 04.12.2017 8:56:26 PM, Count : 143

স্বপ্নসারথি আনিসুল হক: কর্মবীরের প্রয়াণমোতাহার হোসেন : আসলেন, দেখলেন, জয় করলেন। তার পর অকষ্মাত্ চলে গেলেন আমাদের প্রিয় মেয়র আনিসুল হক। তার এই আসা যাওয়ার মাঝে নিজে যেমন স্বপ্ন দেখলেন, অন্যকেও স্বপ্ন দেখালেন। সেই সঙ্গে সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগালেন নগরবাসিকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শা-জাহান’ কবিতায় অংশ বিশেষ দিয়েই তাকে বিশেষায়িত করা যৌক্তিক: ... ‘তুমি চলে গেছ দূরে, সেই বীজ অমর অংকুরে, ওঠেছে অমর-পানে, কহিছে গম্ভীর গানে-যতদূর চাই, নাই নাই সে পথিক নাই। প্রিয়া তারে রাখিল না, রাজ্য তারে ছাড়ি দিল পথ...স্মৃতি ভারে আমি পড়ে আছি; ভারমুক্ত সে এখানে নাই।’ মূলত: এটাই আজ বড় বাস্তবতা। বড় সত্যি কথা। বহু বিশেষণে বিশেষায়িত হতে পারেন তিনি। তিনি ছিলেন একাধারে উদ্যোক্তা, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক। মেয়র হিসেবে এই মানুষটা স্বপ্ন দেখেছেন নগর ও নগরবাসীকে নিয়ে। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেলো। তিনি রাজনীতির ধ্রুব তারা- কর্মে, মানবতায় উন্নয়নে, সংস্কারে নতুন এক মাত্রা যুক্ত করলেন। বিশেষ করে রাজনীতিতে নেমে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র হওয়া পর নগরীকে নিয়ে, নগরীর মানুষের সমস্যা সমাধানে স্বপ্ন দেখলেন, স্বপ্ন দেখালেন উন্নয়নের, সম্ভাবনার। ঠিকই মাত্র তিন বছরের মধ্যে নগরীকে নিয়ে, নগরবাসীর সমস্যা নিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তায়নের পথে যাত্রা শুরু হলো। দৃশ্যমান হলো তার স্বপ্নের বুনন ও বাস্তবায়ন। তার কর্ম, জীবন এবং জীবনাচার ও স্বপ্ন দেখা এবং তা বাস্তবায়নের যে পথনির্দেশিকা রেখে গেলেন তা থেকে রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক, মানবতাবাদি, উন্নয়নকর্মী নির্বিশেষে সবার শিক্ষণীয় এবং অনুকরণ করার আছে অনেক কিছু। তিনি জীবন এবং কর্মকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন বলেই জীবনের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি কাজে এসেছে সফলতা। তিনি নিজেই কথা প্রসঙ্গে বলতেন, ‘জীবন হচ্ছে যুদ্ধ ক্ষেত্রে, প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকার নামই জীবন।’

সাত্যিকার অর্থে তিনি তার যাপিত জীবনের প্রতিটি সময়ে, প্রতিটি কাজে এখন প্রাসঙ্গিকভাবেই মেয়ার আনিসুল হক এর তিন বছরের মেয়র কালকে নিয়ে বর্ণনার অবকাশ আছে। বর্ণনাটা এ জন্যই যে, যারাই জনপ্রতিনিধি হবেন বা আছেন, যারা জনগনের কল্যাণ, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন তাদের কাছে এটি একদিকে শিক্ষণীয় এবং অন্যদিকে অনুকরণীয় এবং অনুসরণ যোগ্য বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে শপথ নেয়ার পর নাগরিকবান্ধব কিছু উদ্যোগ নেন আনিসুল হক। এর মধ্যে অন্যতম তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা থেকে ফার্মগেটের রেলগেট পর্যন্ত সড়ক থেকে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত। ওই বছরের ২৯ নভেম্বর অভিযানও চালনো হয়। তখন কিছু বাস মালিক তাকে অবরুদ্ধ করে। তবে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদে তিনি সফল হন। পরে ওই সড়কটির আধুনিকায়ন করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। সড়কের আইল্যান্ডে লাগিয়েছেন দৃষ্টিনন্দন গাছ। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি এ সড়কটি কারপার্কিং ঘোষণা করেন আনিসুল হক।

কাজের মান নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ভুঁইফোড় ঠিকাদারদের প্রশ্রয় দিতেন না আনিসুল হক। সেইসব ঠিকাদাররা বিভিন্ন সময় মেয়রের নানা জনবান্ধব কাজে বাধাও দিতেন। কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে পিছু হটেননি মেয়র। পেশাদার ঠিকাদার ছাড়া অন্যদের নগরভবনে ঘোরাঘুরি নিষিদ্ধ করেন তিনি। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর রাজধানীর কাওরান বাজার থেকে মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতে কাঁচাবাজার সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেন মেয়র। এজন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেন তিনি। ব্যবসায়ীরাও তার এ উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দেন।

এ বছরের ১৮ মে নারীদের কেনাকাটার জন্য মহাখালীতে একটি উইমেনস হলিডে মার্কেট উদ্বোধন করেন আনিসুল হক। এর অংশ হিসেবে প্রত্যেক নারী উদ্যোক্তার জন্য কমপক্ষে ২৫ লাখ টাকা করে জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থার করার ঘোষণা দেন তিনি। পরিচ্ছন্নতা কাজে গতি বাড়াতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দেন তিনি। পরিচ্ছন্নতা কাজসহ অন্যান্য উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে তিনি প্রায়ই ভোরে, কখনো কখনো গভীর রাতে ঝটিকা অভিযানে বের হতেন। অনেক আগে সড়কে এলইডি বাতি সংযোজনের পরিকল্পনা করেছিলেন আনিসুল হক। এজন্য বড় একটি প্রকল্পও হাতে নেন।

এছাড়া মেয়র হিসেবে আনিসুল হকের অন্যান্য কাজের মধ্যে অন্যতম ছিলন আমিন বাজার থেকে শ্যামলী সড়ক পার্কিং ফ্রি ঘোষণা, হয়রানি রোধে ঠিকাদারদের বিল অফিসে পৌঁছে দেওয়া, সড়কে সাড়ে চার হাজার আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, ২২টি ইউলুপ নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপন, ২০ হাজার বিলবোর্ড উচ্ছেদ ও পরিকল্পিত বিলবোর্ড স্থাপন, সবুজায়নে ইকো-বাস সার্ভিস চালু, জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ, প্রধান সড়কগুলো রিকশামুক্ত করা, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পাবলিক টয়লেট স্থাপন, কারওয়ান বাজার ডিএনসিসি মার্কেট থেকে ব্যবসায়ীদের মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতে স্থানান্তর।

অসুস্থ হয়ে গত জুলাই থেকে দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যের এক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন ডিএনসিসি মেয়র। ওই সময়েই তার এসব উদ্যোগ থমকে যায়। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন আনিসুল হক। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে বিটিভিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে মুখোমুখি বসিয়ে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন তিনি। ব্যবসায়ী হিসেবেও আনিসুল হক ছিলেন সফল। ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালে বিজিএমই-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ও ২০০৮ সালে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি নির্বাচিত হন।

এ বছরের ২৯ জুলাই লন্ডনে যান আনিসুল হক। সেখানে হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেরিব্রাল ভাসকুলাইটিসে (মস্তিষ্কের রক্তনালীর প্রদাহ) আক্রান্ত এই গুণীজনের জীবনাবসান হলো সেখানেই। গত বৃহস্পতিবার ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আনিসুল হক। ফলে কাজ দিয়ে তার ইতিহাস গড়ার স্বপ্নটা থমকে গেলো। তার বিদেহী আত্নার মাগফেরাত কামনার পাশাপাশি প্রত্যাশা থাকবে নগরীকে নিয়ে , নগরীর মানুষকে নিয়ে তার অসমাপ্ত স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে। একই সঙ্গে দেশের আপামর মানুষের উন্নয়ন, ভাগ্য পরিবর্তনে যারা রাজনীতি করেন তাদের কাছে প্রয়াত আনিসুল হকের কর্ম, স্বপ্ন, স্বপ্ন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নিষ্টা , সততা, আন্তরিকতা, প্রতিশ্রুতিকে অটল এবং বিশ্বস্থ হয়ে এগুবেন ভবিষ্যতের পথে। তবেই এক স্বপ্নবাজ, প্রতিশ্রুতিশীল , জনবান্ধব প্রয়াত আনিসুল হক এর আত্না শান্তি পাবে। একই সঙ্গে দেশ , জাতি সমভাবে উপকৃত হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft