ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবতে হবে
Published : Wednesday, 6 December, 2017 at 9:19 PM, Count : 105
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবতে হবেরায়হান আহমেদ তপাদার : পত্রিকার পাতায় প্রতিদিনের খবরে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, হত্যা- এসব অপকর্ম যারা করে তারা তো কোনো না কোনো পিতা-মাতারই সন্তান। অথচ দিনবদলের প্রতিযোগিতায় আমরা হারাচ্ছি আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। হারাচ্ছি ধর্মীয় সম্প্রীতি আর মানবিক মূল্যবোধ। নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পড়াতে টাকার বস্তা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছি। তারপরই আমাদের দায়িত্ব শেষ। আর খোঁজ-খবর রাখছি না- আমার সন্তান সেখানে কী শিখছে, কী পড়ছে, তাদের কারিকুলাম কী, শিক্ষার পরিবেশ কেমন, বন্ধুবান্ধব কারা, তাদের পরিবারের অবস্থান কোন ধরনের ইত্যাদি ইত্যাদি। আগেকার দিনে সন্তানদের বন্ধু-বান্ধবদের সুবাদে তাদের পরিবারের সঙ্গেও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠত। এখন কে কার খবর রাখে? সবাই ছুটছে অর্থের পেছনে, যেন টাকা হলেই সব হবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। মনে রাখতে হবে, টাকা দিয়ে অনেক কিছু সম্ভব হলেও সবকিছু সম্ভব নয়। যেমন চাইলেও টাকা দিয়ে আপনি সন্তান মানুষের মতো মানুষ করতে পারবেন না। অভিভাবকদের উপলব্ধির সময় এসেছে যে, ব্যাংকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জমানো, ফ্ল্যাট-বাড়ি বা গাড়ি নিয়ে সুখী হওয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা কখনো সুখ এনে দিতে পারবে না। কেননা সুখী হওয়ার জন্য প্রয়োজন আত্মতুষ্টি, সুস্থ জীবন ও ধর্মীয় চর্চা এবং চারপাশকে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করা। এক জীবনে প্রিয় সন্তানকে যথাযথভাবে গড়ে না তুলে টাকার ওপর ছেড়ে দিয়ে, নিজেও টাকা কামানোর জন্য বৈধ-অবৈধ পথে হন্যে হয়ে ছুটে এক সময় দেখবেন আপনার বাড়ি, গাড়ি সবই ঠিক আছে শুধু ঠিক নেই প্রিয় সন্তান। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বেশ পরিচিত। দেশটি একটি স্বাধীন ও মুসলিম দেশ হিসেবে ঐতিহ্য অনেক। আমাদের সংস্কৃতি হবে অবশ্যই নান্দনিক ও সুন্দর। সংস্কৃতিমনা হওয়াও আমাদের উচিত। সংস্কৃতি জাতির প্রাণ।
সংস্কৃতি বলতে শুধু বাদ্যযন্ত্র, গান-বাজনা, টেলি ছবি নয়। আমার সোনার বাংলাদেশ আমি আমার অস্তিত্ব দিয়ে দেশকে অবশ্যই ভালোবাসব। দেশপ্রেম যার নেই সে মানুষ হিসেবে গণ্য হয় না। আমার দেশের সংস্কৃতিই আমার পরিচয় বহন করবে। সংস্কৃতি একটি জাতির বাহ্যিক পরিচয় বহন করে। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি, গোষ্ঠী, সমাজের মাঝে আলাদা আলাদা সংস্কৃতি রয়েছে। একটি জাতি ভালো কি মন্দ তা আমরা বুঝতে পারি তার সংস্কৃতি দেখে। প্রত্যেক জাতির আলাদা সংস্কৃতি রয়েছে। একজন মানুষ তার দেশের সংস্কৃতি তার মাঝে বপন করেন এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- সংস্কৃতি বা প্রগতির নাম আধুনিকতা না-কি অশ্লীলতা? আমরা জানি, দেশীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি ধর্মগত দিক দিয়েও মানুষের সংস্কৃতিতে পার্থক্য আছে। যেমন-একজন হিন্দু প্রত্যহ প্রভাতে স্নান করে জলখাবার খেয়ে ঘর থেকে বাহির হন। আবার অনেকে পূজা অর্চনাও করে থাকেন। আর কর্মস্থলে গিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে নতুন দিন আরম্ভ করেন, এটা তাদের সংস্কৃতি। অন্যদিকে একজন মুসলিম সুবহে সাদিকে ঘুম হতে ওঠে ওযু বা গোসল সেরে নামাজ আদায় করেন। পরে সকালের নাশতা খেয়ে বিসমিল্লাহ বলে কর্মক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন। সুতরাং এখানে পার্থক্য বিদ্যমান। সন্তান যখন অমানুষ বা বিপথগামী হবে তখন আপনি চাইলেও বাড়ি-গাড়ি কিংবা সব অর্থ সম্পদের বিনিময়ে প্রিয় সন্তানকে সুসন্তান হিসেবে ফিরে পাবেন না। তার মানে সুসন্তানই দুনিয়া এবং আখেরাতের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হওয়া উচিত। কিন্তু আফসোস, আমরা কি তা ভাবছি! প্রিয় সন্তানরা কেন খারাপ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, এর কারণ কী? সন্তানদের সম্পর্কে কোনো চিন্তা নেই বলেই তাদের মাধ্যমেই আজ সংঘটিত হচ্ছে যত ধরনের ঘৃণ্য অপকর্ম। সন্তান ভালো হবে না খারাপ হবে, তা নির্ভর করে পিতা-মাতার ওপর। পিতা-মাতা আদর্শবান হলে, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এবং তারা সন্তানকে সুশিক্ষা দিলে তবেই সন্তান একজন সুসন্তান হিসেবে গড়ে উঠবে।
মনে রাখতে হবে, ধন-সম্পদ নয়, সুসন্তানই শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলাকারী নিহত আবির রহমানের বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, আমি দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাই। আর কোনো বাবাকে যেন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। সব বাবা-মায়ের কাছে আহ্বান, সন্তানদের খোঁজ নিন। কোথায় যায়, কী করে খোঁজ নিন। ছেলেটি বা মেয়েটি কোথায় যায়, কী করে, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে খবর রাখতে হবে। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতাই তাকে অপরাধে উসকে দিয়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা। বিলুপ্ত হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবারের শেকড়ের শক্তি। অগোচরে, অবহেলায়, অবলীলায় ক্রমাগত ভুলের মাসুল দিয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের সন্তানরা। এইতো ধরুন না, গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের ঘটনাকে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি হামলা যাই বলা হোক না কেন, বাংলাদেশের জন্য এটি প্রথম এবং বিব্রতকর একটি ঘটনা। এ ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশে জঙ্গি কিংবা আইএস আছে বা নেই- এই নিয়ে হয়তোবা নতুন ধূম্রজাল সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ সরকার যথোচিত ভূমিকা নিয়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানের একটি বার্তা বিশ্ববাসীকে আবারও দিতে পেরেছে সত্যি। কিন্তু আমরা যারা দেশের জনগণ, সমাজ ও পরিবারের অধিকর্তা তাদের কাছে নতুন একটি বার্তা দিচ্ছে- কীভাবে বড় হচ্ছে আপনার প্রিয় সন্তান? আপনি তার যথাযথ খবর রাখছেন তো?’ কেননা, গুলশান হামলা থেকে শুরু করে তার আগেও বিভিন্ন অতর্কিত হামলা ও খুনের ঘটনায় ধৃত সন্ত্রাসীদের পারিবারিক ও শিক্ষা পরিচয় অভিভাবকদের মনে নতুন দুশ্চিন্তার উদ্রেক হয়েছে।
পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, দেশে জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে ধর্মপরায়ণ ভালো শিক্ষিত পরিবারের আধুনিক শিক্ষিত সন্তানরা। এদের অনেকেই দেশের এমনকি রাজধানী ঢাকার নামকরা স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অথবা অধ্যয়নরত ছাত্র। ব্যাপারটি খুবই ভয়াবহ এবং হতাশার কারণ বটে।
দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা ছিল দেশে যারা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত তারা মাদরাসা পড়া এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে সেখানে ঘাতকদের বেশিরভাগই এসেছে উচ্চ-মধ্যবিত্ত অথবা উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে। যাদের প্রায় সবাই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ালেখা করে দেশের একটি খানদানি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে।
বর্তমান যুগের ব্যস্ত দম্পতিদের প্রিয় সন্তান বড় হচ্ছে অশিক্ষিত কাজের লোকের তত্ত্বাবধায়নে। কী শিখবে সে এই কাজের লোকের কাছে? কী শিখবে দামি খেলনা আর প্রযুক্তির রঙিন প্রলোভনে ব্যস্ত থেকে? আমরা খবর রাখি না, রাত জেগে পড়ার নামে প্রিয় সন্তান মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে কথা বলে? অনলাইন চ্যাটিংয়ে মেতে ওঠে কার সঙ্গে? একই বাসায় থেকে ছেলেমেয়ে কেন দরজা আটকে রাখে? কেন আমরা ভাবছি না এগুলো। তাহলে এসব কি আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে সন্তানদের বিরত রাখা নয়, সে যেন প্রযুক্তির ভালো বিষয়গুলো গ্রহণ করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের পরিবারগুলোতে আদি বন্ধনের ঐতিহ্য ধ্বংস হতে চলেছে। দাদা-দাদু, নানা-নানু, বাবা-মা, চাচা-চাচি, মামা-মামি, খালা-খালু, ফুফা-ফুফুর চিরায়ত পারিবারিক সম্পর্কগুলো ঘনিষ্ঠতা হারাচ্ছে। বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে শেয়ার করে না তাদের সংগ্রামী ব্যক্তি ও সংসার জীবনের গল্প। সন্তানের কাছে তাদের দাদা-নানাদের ঐতিহ্যের কাহিনী শোনানো হয় না। সন্তানকে বলা হয় না, সন্তানের কাছে পিতা-মাতা হিসেবে তারা কী চায়। তাদের সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির রীতিনীতির কথা অনেক বাবা-মায়ের সন্তানরাই জানে না। অর্থাত্ সন্তানের মাঝে আমরা স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে পারছি না। আমরা সন্তানদের শেখাতে পারছি না যে, প্রত্যেকটি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পারিবারিক সংস্কৃতির ধারা এবং কিছু মূল্যবোধ।
শেকড় গ্রামে হলেও গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, তাই প্রকৃতির আলিঙ্গন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। প্রকৃতির আলিঙ্গন থেকে দূরে থাকলে হূদয়ে মায়া জন্মাবে কেমন করে? প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হচ্ছে শ্রেষ্ঠ শৈল্পিকতার আলিঙ্গন। আমাদের পারিবারিক বিনোদনের জায়গাগুলো ছোট হয়ে আসছে। বাবা-মা, ভাই-বোন মিলে একসঙ্গে টিভির অনুষ্ঠান দেখা হয় না। যাওয়া হয় না সিনেমা হলে। সেখানে নেই পরিবেশ। নেই ভালো সামাজিক ছবি। তারপরও কিন্তু কিছু কিছু ছবি ভালো হচ্ছে। কিন্তু সন্তানদের নিয়ে দেশীয় সংস্কৃতির এসব বিনোদন শেয়ার করা হচ্ছে না। যাওয়া হয় না নাট্যমঞ্চে। পারিবারিক ভ্রমণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তো আছেই। তাছাড়া আত্মীয়দের বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়া এবং তাদের দাওয়াত করে খাওয়ানোর রেওয়াজটাও আধুনিকতার নামে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আটকে গেছে। এ কারণে আত্মীয়তার সামাজিক বন্ধনগুলো কাছে টানছে না সন্তানদের। অভিভাবকরা সন্তানদের ভাষা বুঝতে পারছেন না। তারা অনেক সময় সন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করছেন না, আলাপ-আলোচনায় সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন না। সন্তানরাও অভিভাবকদের প্রত্যাশার কথা আমলে নিতে চাচ্ছে না।
খোলা মাঠে শিশুদের সামাজিকীকরণ ঘটছে না। শিশুরা বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে। তাছাড়া প্রযুক্তির প্রসার ও সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমের কারণে তরুণ সমাজে খুব দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড এবং দোস্ত কালচার। পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগে পর্নোগ্রাফির বিস্তার হওয়ার কারণে লজ্জা ও নৈতিকতার বাঁধন দ্রুত শিথিল হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া ধর্মীয়, পারিবারিক এবং সামাজিক রীতিনীতি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। পরিশেষে বলব, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বাঙালিপনার দোহাই দিয়ে যেভাবে প্রাশ্চাত্যের সংস্কৃতির অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ ভেসে যাচ্ছে, সেটা কখনো হাজার বছরের যে বাঙালি সংস্কৃতির সংজ্ঞায়ন দেয়া হয় তার সঙ্গে মেলানো যাবে না। তাই এসব থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতেই হবে। এভাবে চললে শিশুদের ভবিষ্যত্ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে একবার ভেবে দেখবেন কী?
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft