তরুণদের হতাশা দূর করতে হবে
Published : Sunday, 7 January, 2018 at 8:53 PM, Count : 111
তরুণদের হতাশা দূর করতে হবেখন্দকার মুনতাসীর মামুন  : জীবন গঠনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সময় তারুণ্যই। যদিও দেশে মাধ্যমিক শেষ না করেই ঝরে পড়ছে ৪০ শতাংশের বেশি তরুণ। শ্রমবাজার খুব বেশি সম্প্রসারণ না হওয়ায় তরুণদের মধ্যে বাড়ছে বেকারত্বের হার। অনেকেই আবার ঝুঁকছে নেশার দিকে। নাগরিক কর্মকাণ্ড বা রাজনীতি কোন কিছুর সঙ্গেই নেই তারুণ্যের বড় অংশ। কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েটের তৈরি গ্লোবাল ইয়ূথ ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ২০১৬ বলছে, তারুণ্য উন্নয়ন সূচকে ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম। 
স্বাস্থ্য ও জীবনমান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনা, নাগরিক এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ- এ পাঁচটি স্তম্ভের ভিত্তিতে সূচকটি তৈরি করেছে কমনওয়েলথ। তথ্যের উত্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আছে ইউনেস্কো, ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ), ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন, বিশ্বব্যাংক, গ্যালপ ওয়ার্ল্ড পোল ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। 
কমনওয়েলেথের সূচকে বাংলাদেশের তরুণদের অবস্থান নিঃসন্দেহে নৈরাশ্যকর। অথচ দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশই তরুণ। এদের প্রায় ২২ লাখ প্রতি বছর কর্মবাজারে আসছে। লাখ সাতেককে আমরা ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিচ্ছি বিদেশে। কখনো মালয়েশিয়ায়, কখনো সৌদি আরবে তারা মানবেতর কষ্ট করে দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে এয়ারপোর্টে লাঞ্ছিত হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। বাকিদের মধ্যে লাখ খানেক সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়। আর লাখ দুয়েক বেসরকারি উদ্যোগে বা নিজ উদ্যোগে কর্মসংস্থান করতে পারে। কিন্তু বাকিরা?  
মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও শিল্পায়নসহ নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির অভাব, সেই সঙ্গে যথোপযুক্ত শিক্ষা ও দক্ষতা, নিষ্ঠা ও সততার অভাবে শিক্ষিত যুবকদের ৭০ ভাগই বেকার, নয়তো প্রত্যাশিত কাজ পাচ্ছে না। তারুণ্যের স্বপ্ন-সম্ভাবনা উচ্চ শিক্ষাঙ্গন পেরিয়ে কর্মজীবনে ঢোকা পর্যন্ত কতটুকু টিকে থাকে, আর কতটা স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা ও হতাশায় বিলীন হয়, তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা চরম বৈষম্যমূলক। সে বৈষম্য স্কুল-মাদ্রাসায় যেমন প্রকট, তেমনি প্রকট শহর-গ্রামেও। কিন্তু সবচেয়ে বড় বৈষম্য ধনী-গরিবের জন্য শিক্ষার আলাদা আলাদা ব্যবস্থায়। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিশু, কিশোর, তরুণেরা এখন একযোগে অভিভাবক ও কতিপয় শিক্ষা-বণিক শ্রেণীর আগ্রাসনের শিকার। আমরা বাস করছি বিবিএ, এমবিএ এর যুগে। স্কুল-কলেজগুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। আগে হাই স্কুল মানেই ছিল বিশাল মাঠ, যন্ত্র ভর্তি বিজ্ঞানাগার আর বই সমারোহ নিয়ে পাঠাগার। আর এখন? আছে নোটবই, মোবাইল ফোন, ক্লাস টেস্ট, ফটোকপি মেশিন। এছাড়া আছে জঙ্গিবাদসহ নানা প্ররোচনা ও ফাঁদ। সন্তানদের কাছে অভিভাবকদের দাবি, ‘আশপাশে তাকাবে না, বাইরের বই পড়বে না, অন্যদের সঙ্গে মিশবে না, বাইরে যাবে না, নিজের দিকে দেখো, ফার্স্ট হতে হবে, ধনী (অনেক অর্থের মালিক) হতে হবে।’ প্রায় অভিভাবকই চান সন্তান আত্মকেন্দ্রিক হোক, বাজারের চাহিদা বুঝুক ইত্যাদি। প্রায় সবাই চান শিক্ষার্থী গাইড বই, নোটবই পড়ুক, কোচিং সেন্টারে পড়ুক, এরা সবাই চিন্তাশূন্য, বিশ্লেষণশূন্য ও প্রশ্নশূন্য রোবটে পরিণত হোক।  
কিছু ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা আমরা জানি। খুবই নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ও তদারকির মধ্যে; বেঁধে দেয়া সীমার মধ্যে শিক্ষা, চিন্তা ও তত্পরতায় থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। প্রাইভেট বা বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নেই, কোনো সংগঠনের প্রকাশ্য অস্তিত্ব বা তত্পরতা নেই। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন ক্লাব বা সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কিছু ক্লাসবহির্ভূত তত্পরতা করেন। এর বাইরে যাওয়ার সাধ্য শিক্ষার্থীদের নেই। এই নিয়ন্ত্রিত জগতে কীভাবে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত তারুণ্যের বিকাশ ঘটবে? তরুণেরা কীভাবে নিজেদের ভেতরের অসীম ক্ষমতার সন্ধান পাবেন? কীভাবে তার মধ্যে সামষ্টিক স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থের যুক্ততার বোধ আসবে? কীভাবে সে বুঝতে শিখবে, সমষ্টি মানুষ আর প্রকৃতি তার অস্তিত্বের অংশ? অযৌক্তিক, অনৈতিক দম বন্ধ করা পরিবেশের বিরুদ্ধে কেউ কি প্রতিরোধ করতে পারে, যারা নিজেরাই মুক্ত হওয়ায় শ্বাস নিতে পারেন না। স্বার্থপর চিন্তা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতাহীন অবস্থা তাদের কোথায় নিয়ে যাবে?     
ঐশীর কথাই একবার ভাবুন না? বিত্ত-বৈভবে বেড়ে ওঠা ঐশী মাদকের নেশায় তার মা-বাবাকে খুন করেছিল। মা-বাবাকে খুন করার সময় কি তার স্বাভাবিক জ্ঞান ছিল? তার বোধশক্তি সচল ছিল? কোন কিছুই ছিল না। সুস্থ মস্তিষ্কে ঠাণ্ডা মাথায় কেউ কাউকে সহজে খুন করতে পারে না। ঐশী যখন মা-বাবাকে খুন করে তখন তার বোধশক্তি অচল, অবচেতন ছিল। যে কোন মাদকই তাই করে। নিবরাস ইসলামের কথা মনে করে দেখুন। গুলশানের রেস্তোরাঁয় জিম্মি উদ্ধার অভিযানে নিহত সন্দেহভাজন হামলাকারীদের মধ্যে একজন মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিবরাস। ছেলেটি আর ১০ জন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রের মতোই ছিল। হাসতে, মজা করতে ভালোবাসতো। ফুটবল পাগল ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে বিরামহীম আড্ডায় বিভোর থাকত। কিন্তু হঠাত্ করেই বদলে গেল নিবরাস। মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসের ছাত্র হলেও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাতেই অবস্থান করতে শুরু করল। কিন্তু কারো সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখত না। ফোন করত না। কোন নাম্বার ব্যবহার করত তাও জানাত না কাউকে। নিবরাস ও ঐশী কেন বদলে গেল? কেন তারা সমাজ থেকে দূরে সরে গেল? তরুণদের এই বদলে যাওয়া নিয়ে রাষ্ট্র কি কখনো কিছু ভেবে দেখেছে? রাষ্ট্রের কি মনে হয় না যে, শতসহস্র তারুণ্যের ছন্দ ধরে রাখার বিষয়ে তারও কিছু করণীয় আছে?  
তরুণরা আদর্শ বোধ ও স্বপ্ন লালন করতে পারছে না। এগুলো না থাকলে বিশেষ করে স্বপ্ন না থাকলে কেউ উদ্যমী হতে পারে না, সৃষ্টিশীল কাজে অংশ নিতে পারে না। তরুণদের সামনে এখন স্বপ্ন আছে অর্থ উপার্জনের। কিন্তু তার পথও খোলা নেই। ফলে হতাশা, ক্ষোভ বিরাজ করছে। এগুলো চাপা পড়ে আছে। প্রকাশের পথ নেই। প্রকাশ হতে পারত যদি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকত।   
পাবলিক বা সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন আছে, সাংস্কৃতিক সংগঠন নাট্যদল ইত্যাদিও আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যায়, নিপীড়ন, বৈষম্যবিরোধী চিন্তা ও সক্রিয়তায় এসব সংগঠনের ভূমিকা ও লড়াইয়ের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আছে। কিন্তু যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের ছাত্রসংগঠন আর শিক্ষক নেতাদের জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই জমা হয়েছে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা। সরকারি ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য এতটাই প্রবল যে অনেক সময় হল বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় না। একইভাবে সরকারি ছাত্র সংগঠনের দাপটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য হলের ভেতরের পরিস্থিতি খুবই নাজুক। 
বাংলাদেশে কোন শিক্ষার্থী এইচএসসি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে এটাই বুঝে উঠত পারে না তার লক্ষ্য কী, কোন পথে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলবে। দেশের ছাত্রদের ক্যারিয়ার নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখার কথা রাষ্ট্রের। পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও শিক্ষার্থীদের নানারকম বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালেই দেখা যায় শিক্ষায়, গবেষণায়, বিজ্ঞান চর্চায় কতটা এগিয়ে আছে ওরা। প্রতিটা শিক্ষার্থীদের জন্য অবসর সময়ে কত ব্যবস্থা। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের জন্য রয়েছে চাকরির সুবিধা। চাকরির কথা বাদ দিলাম। অবসর সময়ে তাদের জন্য রাখা হয়েছে বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা। যেখানে রাখা হয় একজন শিক্ষার্থী কীভাবে তার ক্যারিয়ার গড়বে। দেয়া হয় কাউন্সেলিং। আমাদের দেশেও একটি বাস্তবসম্মত যুব নীতির ভিত্তিতে তারুণ্যের অমিত সম্ভাবনাকে সৃষ্টিশীল কাজে লাগানো সম্ভব। তরুণদের ভেতরে যদি সত্য ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা পায় তাহলে কোন বাধাই তাদের থামাতে পারবে না। তবে সেজন্য সবার আগে প্রয়োজন সরকারের স্বদিচ্ছা। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা, তাদের মতামতের গুরুত্ব দেয়া, কর্মসংস্থান ও সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্ধিত জনসংখ্যার বেকারত্ব নিরসনের একমাত্র উপায় হতে পারে ব্যাপকভিত্তিক আত্মকর্মসংস্থান। আর এজন্য প্রয়োজন একটি দায়িত্বশীল, কর্মনিষ্ঠ তরুণ উদ্যোক্তা শ্রেণি। তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করার মাধ্যমেও রাষ্ট্র এ ব্যাপারে একটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।  
বর্তমান প্রজন্মের নৈতিকতার ভিত্তিও বেশ দুর্বল। শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যবোধের চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি রাজনীতিতেও ইতিবাচক কাজের চর্চার অভাব তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্যমূলক শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধের অবক্ষয় দেশের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকেই ভূমিকা নিতে হবে। সমাজে প্রশ্নহীন আনুগত্য, অন্ধবিশ্বাস, ক্ষমতার নৃশংসতা, চিন্তা-বিশ্লেষণহীন রোবট সংস্কৃতির চাষ বন্ধ হলে জঙ্গিবাদ তো বটেই, কোন ধরনের সন্ত্রাস আর আধিপত্যেরই জায়গা হবে না। চারদিকের শৃঙ্খল আর চাপ থেকে তরুণেরা মুক্ত না হলে এই মুক্তির পথও তৈরি হবে না। 
[লেখক : সাংবাদিক] 


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft