বায়োফুয়েল উৎপাদনের বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার
Published : Monday, 8 January, 2018 at 9:33 PM, Count : 118
বায়োফুয়েল উৎপাদনের বিষয়টি ভেবে দেখা দরকারড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম : দিন যাচ্ছে আর জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য মতে ২০১২-১৩ অর্থবছরে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে মোট জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল ৪১ লাখ ২৯ হাজার ২৬২ টন, আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৮ টনে। 
জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে ব্যাপকভাবে মোটর যানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। বিআরটিএ’র তথ্য মতে গত অক্টোবর ’১৭ পর্যন্ত দেশে মোটরযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৭৯২টি। ২০১৪ সালে ছিল ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৪৪টি।
রাজধানী ঢাকায় গত অক্টোবর মাসে মোটর যানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭৪টি, যা ২০১০ সালে ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭টি। জ্বালানি তেলের চাপ কমাতে সিএনজির ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে দেশে গ্যাসের পরিমাণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসে বিকল্প হতে পারে বায়োগ্যাস বা বায়োফুয়েল। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। গত ২০১০ সালে একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল- চিনি কলগুলোতে উত্পাদিত চিটাগুড় থেকে বায়োফুয়েল উত্পাদন করা হবে মোটরযান চালানোর জন্য। বছর ৬০ লাখ টন বায়োফুয়েল উত্পাদনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে এই প্রকল্প বা উদ্যোগ থেমে যায়। ২০০৬ সালে চিনিশিল্প করপোরেশনের বিজ্ঞানিরা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সঙ্গে যৌথ গবেষণা শুরু করেন। তারা চিটাগুড় থেকে মোটর গাড়ি চালানো যায় এমন পাওয়ার ইথানল  উত্পাদনে সফল হন। পরে পেট্রোলের সঙ্গে ১০ শতাংশ পাওয়ার ইথানল মিশিয়ে গবেষণার সফলতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হন গষেকরা। এ সাফল্যের ভিত্তিতে চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থা ২০০৭ সালে পাওয়ার ইথানল তৈরির জন্য দর্শনা চিনিকলে (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) একটি প্লান্ট স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করে। পরে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।  জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিশ্বে এখন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পাওয়ার ইথানলের সঙ্গে পেট্রোল মিশিয়ে গাড়ি চালানো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে সে ক্ষেত্রে তারা সরাসরি সবুজ শস্য ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ এই প্রথম কোনো উপজাত থেকে ইথানল তৈরি করছে বলে চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থা সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ চিনিশিল্প করপোরেশনের মালিকানাধীন দর্শনা চিনিকলের (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) ডিস্টিলারিতে অ্যালকোহল তৈরির জন্য একটি প্ল্লান্ট বসানো হয়। দেশের চিনিকলগুলোতে প্রতি বছর চিনির উপজাত হিসেবে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন চিটাগুড় পাওয়া যায়। এর বিশ্বের উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাল রেখে বাংলাদেশের চিনি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে চিনিকলগুলোতে চিনি ও গুড়ের পাশাপাশি জৈবজ্বালানি বা ইথানল উত্পাদনের কোনো বিকল্প দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, দেশে যে হারে আখের চাষ দিন দিন কমে যাচ্ছে, তাতে এ শিল্পকে ধরে রাখতে হলে চিনিকলে ইথানল তৈরি করাই সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কৃষক ও ?চিনিশিল্প বেঁচে থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বে জৈবজ্বালানি হিসেবে মূলত ইথানল ব্যবহার করা হয়। আর আখের রস বা মোলাসেস (চিটাগুড়) থেকে প্রথমে ইথানল তৈরি করা হয়। এই ইথানল গ্যাসোলিন (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) এর সঙ্গে ২০-২৫ হারে মিশ্রিত করে অথবা পুরোটাই সরাসরি ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে ব্যবহার করা যায়। এ ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের সামান্য কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হয়। তারা বলেন, গ্যাসোলিনের (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) পরিবর্তে জ্বালানি হিসেবে ইথানল ব্যবহার করলে ৯০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড (গ্রিন হাউস গ্যাস) নিঃসরণ কম হয়। এটি ব্যবহারে ইঞ্জিনের শব্দ কম হয় এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ জন্যই, আধুনিক বিশ্বে ইথানলকে টেকসই জৈবজ্বালানির অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা বলেন, আখ উত্পাদনে শীর্ষ দেশ ব্রাজিল তার মোট উত্পাদনের ৫৬ শতাংশ আখ জৈবজ্বালানি (ইথানল) উত্পাদনে ব্যবহার করে এবং প্রতিটি ইঞ্জিনচালিত গাড়িতে বাধ্যতামূলকভাবে ২০-২৫ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত গ্যাসোলিন ব্যবহার করছে ব্রাজিলিয়ানরা। উল্লেখ্য, জ্বালানি নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ২০০৯ সালে জৈবজ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যে নীতিমালায় চলতি ২০১৭ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। চীনেও ২০২০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত গ্যাসোলিন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। শুধু চীন ও ভারত নয় যেসব দেশে আখ উত্পাদিত হয় যেমন: পাকিস্তান, তুরস্ক, মেক্সিকো, থাইল্যান্ডসহ প্রায় সব দেশই এ পথে হাঁটছে। 
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে এখন আখ উত্পাদন করে চাষির পাশাপাশি চিনিকলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দেশেরও বিরাট লোকসান হচ্ছে। তাই এ দেশে আখ উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ চাষি ও চিনিকলকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখে অন্যান্য দেশের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে জৈবজ্বালানি তৈরির বিকল্প নেই। কারণ এক টন আখ থেকে চিনি (রিকভারি ৭.৫০ শতাংশ হলে) পাওয়া যায় ৭৫ কেজি, যার বর্তমান বাজার মূল্য ৭৫ ী ৪০= ৩০০০ টাকা। আর ওই আখ থেকে প্রায় ৮৫ লিটার জৈবজ্বালানি (ইথানল) পাওয়া যায়, যার বাজার মূল্য (১০০ ী ৮৫)= ৮৫০০ টাকা। তাই জৈবজ্বালানি উত্পাদন কৃষকের সমৃদ্ধি বাড়াবে। জৈবজ্বালানি শতকরা ৩২ ভাগ ব্রাজিলে, শতকরা ১৫ ভাগ ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে, শতকরা ৩ ভাগ চীনে, শতকরা ১ ভাগ করে ভারতে ও থাইল্যান্ডে এবং শতকরা ৫ ভাগ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে। আমেরিকায় ৪০ ভাগ ভুট্টা জৈবজ্বালানিতে ব্যাবহার হয়, ইংল্যান্ডে ১৮ শতাংশ জৈবজ্বালানী ব্যাবহার হয়। ভুট্টা ও গম দিয়ে এসব জৈবজ্বালানি যা তৈরি করা হচ্ছে যা দ্বারা অন্তত ছোটখাট কয়েকটি দেশের মানুষের খাদ্য জোগান দেয়া যাবে। যেহেতু বায়োফুয়েল উত্পাদনের মূল উপাদান খাদ্যশস্য, তাই এর উত্পাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা খাদ্যমূল্যে স্বাভাবিকভাবেই খারাপ প্রভাব ফেলবে। খারাপ পরিণতির কথা জেনেও মার্কিন কংগ্রেস ২০০৫ সালে শুধু তাদের প্রয়োজনে বায়োফুয়েল উত্পাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সাল নাগাদ ১৩ হাজার ৬০০ কোটি লিটার বায়োফুয়েল উত্পাদন করবে বলে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। বাংলাদেশে জৈবজ্বালানি এখন সময়ের দাবি। এমতাবস্থায় চিটাগুড় থেকে বায়োফুয়েল উত্পাদনের বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।
লেখক: সাবেক কর কমিশনার।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft