অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা
Published : Tuesday, 9 January, 2018 at 9:39 PM, Count : 104
অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রাবাহালুল মজনুন চুন্নূ : দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লাখ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে অর্জিত ষোলোই ডিসেম্বরের বিজয়ের দিনে বাংলার আকাশে লাল-সবুজে খোচিত বিজয় নিশান উড়লেও বাঙালির মনে উঁকি দিয়েছিল অজানা ভয়। কেননা তখনো তাদের জাতির পিতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বাংলায় ফিরে আসতে পারেননি। তিনি তখনো পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারের প্রকোষ্ঠে নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করতে করতে মৃত্যুর প্রহর গুণছিলেন। যার জন্য এই দেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে সেই তিনি শত্রু দেশে বন্দি এই বোধ বাঙালির মনে শেলের মতো বিঁধে চলছিল। যুদ্ধে সর্ম্পূণরূপে বিধ্বস্ত দেশে অস্থির, অনিশ্চিত ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। চারদিকে ধ্বংস আর বিনাশের চিহ্ন। সর্বত্র হাহাকার, ক্রন্দন ধ্বনি। নেতৃত্ব সঙ্কটে অমানিশার অন্ধকারে সদ্য স্বাধীন দেশের সবাই দিশেহারা। চারদিকে নেই, নেই আর নেই। এমনতর পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায়। কারাগারের শৃঙ্খল ভেঙে ১০ জানুয়ারিতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তিনি যখন ফিরে আসলেন এই বাংলায় তখনই পূর্ণতা পেয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয়ার্জন। তার সেই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটি বাঙালির জীবনে এক অনিন্দ্য মহাকাব্যিক চিত্রপট এঁকে দিয়েছিল। 
১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করার আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে বন্দি করে রাখে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার আগেই তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন স্বাধীতার ঘোষণা। সেই ঘোষণায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে স্বাধীন দেশমাতৃকার সন্তানরা নিজ দেশ থেকে হানাদার হটানোর জন্য মরণপ্রাণ যুদ্ধ করেছিল। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানে বন্দি করে ইয়াহিয়া শুরু করেছিল তামাশার বিচার। উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে ভয় দেখিয়ে আপসে বাধ্য করা আর পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণকে খুশি করা। বঙ্গবন্ধুকে মানসিক চাপে ফেলার জন্য তার সেলের পাশে তার জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু অন্য ধাতুতে গড়া। বিচারে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দিতে চাইলে তিনি নির্ভয় চিত্তে বলেছিলেন, আমার লাশটা বাংলার মানুষের কাছে পাঠিয়ে দিও’। ষোলোই ডিসেম্বর তেরানব্বই হাজার পাকিস্তানি সৈন্য মাথানত করে মিত্রবাহিনীর কাছে কাছে আত্মসমর্পণ করলে ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়।  আর নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টো আন্তর্জাতিক নেতাদের চাপের কারণে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। ৮ জানুয়ারি বিবিসিতে প্রচারিত হলো বঙ্গবন্ধুর মুক্তির খবর। আর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠল পুরো জাতি। সমগ্র বাঙালি জাতির প্রাণোচ্ছ্বলতায় ঝলমলে হয়ে ওঠল স্বাধীনতার স্বর্ণ-সূর্য, লাল-সবুজের বিজয়পতাকা। 
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল, নয় জানুয়ারি দিনটি ছিল রোববার। বাংলাদেশের সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যে সারাদেশ আনন্দ উল্লাসে উত্তাল। অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষা করছে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের। বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেও লোকজন ছুটতে শুরু করেছে ঢাকার দিকে। ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে লেখে, ‘বঙ্গবন্ধুর মুক্তি বাংলাদেশকে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে।’ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় লেখা হয়, ‘আজ বহু প্রতীক্ষিত সেই শুভদিন। সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির  আস্থা ও ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষার স্বর্ণসিঁড়িতে হাঁটিয়া হাঁটিয়া স্বাধীন বাংলা ও বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদীর্ঘ ৯ মাস পরে আবার জননী বাংলার কোলে ফিরিয়া আসিতেছেন।’ দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বদেশ, আজাদী থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সব পত্রিকায় প্রধান প্রতিবেদনই ছিল বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে। 
লন্ডন-দিল্লি হয়ে বঙ্গবন্ধু যেদিন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রাণপ্রিয় নেতাকে বরণের জন্য, তার ধ্রুপদী বাণী শোনার জন্য লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল রেসকোর্সের ময়দান, এয়ারপোর্ট রোড আর তেজগাঁও বিমানবন্দরে। বঙ্গবন্ধুর জন্য মানুষের অন্তরে কী প্রগাঢ় ভালোবাসা জমে উঠতে পারে, ঐ দিনের জনসমাগমের ব্যাকুলতা-ব্যাগ্রতার সে দৃশ্য না দেখলে বোঝানো দুষ্কর।  দুপুর ৩টার দিকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট জেট যখন তেজগাঁও বিমানবন্দর স্পর্শ করল তখন একুশবার তোপধ্বনি আর লাখো মানুষের আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে জাতির পিতাকে বরণ করল তার অতি প্রিয় মাতৃভূমি। বঙ্গবন্ধু যখন বিমান থেকে বের হয়ে এলেন, তখন তাকে দীর্ঘ কারাবাসের কারণে রোগাটে, ক্লান্ত কিন্তু আশ্চর্যরকম প্রাণবন্ত মনে হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানালেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদসহ মন্ত্রিপরিষদ। হাত মেলালেন ভারত ও ভুটানের হাইকমিশনারদ্বয়, ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার, রাশিয়ার কনসাল জেনারেল, মার্কিন যুক্তরাষ্টের কনসাল জেনালে হার্বার্ড ডি স্পিভাকও এবং অন্যান্য দেশের কূটনৈতিকরা। এরপর বঙ্গবন্ধু হেঁটে গেলেন ছোট একটি মঞ্চে। প্রাক্তন ইস্ট বেঙ্গল রেজমেন্টস ও মুক্তিবাহিনী তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করল। বঙ্গবন্ধু লাল-নীল রঙের একখানা খোলা ট্রাকে উঠে পড়েন। বাঙালি জাতির প্রাণোচ্ছ্বাস দেখে আবেগে আপ্লুত তিনি রুমাল বের করে চোখ থেকে আনন্দাশ্রু মুছতে লাগলেন। জনতার দিকে হাত নাড়তে লাগলেন। ধীরে ধীরে ট্রাকটি অতি ধীর ও শান্ত ভঙ্গিতে রমনা রেসকোর্স মাঠের সংবর্ধনা সভার উদ্দেশে যাত্রা  শুরু করল। তেজগাঁও থেকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের দূরত্ব খুব বেশি নয়। অথচ এই অল্প একটু পথ অতিক্রম করতেই লেগে গেল প্রায় ঘণ্টা দুয়েক। পুরো রাজপথজুড়েই জনতার ঢল। 
বিমানবন্দর, রাজপথের মতো রেসকোর্স ময়দানও জনসমুদ্র। তিল ধারণেরও কোনো ফাঁক নেই। বঙ্গবন্ধু ট্রাক থেকে নেমে নৌকাসদৃশ্য সভামঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। জনসমুদ্রের বাঁধভাঙা জোয়ার, অকৃত্রিম ভালোবাসা-শ্রদ্ধা আর তাদের মুর্হমুহু হর্ষধ্বনি শুনে বাবার চোখ বেয়ে নেমে এলো আনন্দাশ্রুর ধারা; যে ধারা ৭ কোটি বাঙালির হূদয়ে মিশে তাদের দেখাল নবজীবনের রঙিন স্বপ্ন। ভাষণে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রবীন্দ্রপ্রেমী বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বিশ্বকবি তুমি বলেছিলে ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তুমি দেখে যাও, তোমার আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। তোমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত করে আজ ৭ কোটি বাঙালি যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে। হে বিশ্বকবি, তুমি আজ জীবিত থাকলে বাঙালির বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে।’ সেদিন প্রায় ১০ লাখ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি  দিলেন সেই ধ্রুপদী ঘোষণা, ‘রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাব।’ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে সেদিন প্রায় সতেরো মিনিট জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। সেই ভাষণটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত নব্য স্বাধীন দেশটির পুনর্গঠনের নকশা আর ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের রূপরেখা। বাংলাদেশের আদর্শগত ভিত্তি কী হবে, রাষ্ট্র কাঠামো কী ধরনের হবে, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যারা দালালি ও সহযোগিতা করেছে তাদের কী হবে, বাংলাদেশকে বহির্বিশ্ব স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অনুরোধ, মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ, কৃষক, শ্রমিকদের কাজ কী হবে, এসব বিষয়সহ বিভিন্ন দিক নিয়ে নির্দেশনামূলক বক্তব্য রেখেছিলেন রাজনৈতিক কবি, মুক্তির কবি, স্বাধীনতার কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দিয়েছিলেন দেশ গড়ার ডাক দেন।  তিনি দেশ গড়ার এই ডাককে, এই অভিযাত্রাকে অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশার অভিযাত্রা হিসেবে অভিহিত করেন। তার সেই ডাক বাঙালি চেতনায় নতুনভাবে আশার সঞ্চার করেছিল সেদিন, দিয়েছিল নবসূর্য কিরণে নব জীবনের আশ্বাস। 

লেখক: সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft