ধর্মীয় ও পারিবারিক বন্ধনেই সম্ভব আত্মহনন থেকে মুক্তি
Published : Saturday, 10 February, 2018 at 9:35 PM, Count : 306
ধর্মীয় ও পারিবারিক বন্ধনেই সম্ভব আত্মহনন থেকে মুক্তিমোতাহার হোসেন : প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ অকাতরে নানান কারণে। হত্যাকাণ্ডের চেয়ে আত্মহত্যার প্রবণতাও কম নয়। সম্প্রতি সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, যৌথ পরিবার বিলুপ্ত, সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনে ফাটল, একাকিত্ব, হতাশা, দুশ্চিন্তা, সামাজিক, পারিবারিকভাবে নিগৃহীত হওয়া, অসত্ সঙ্গে মেলামেশা থেকে ধীরে ধীরে সন্তানরা বিপদগামী হয়। এক সময় বিপদের চরমতম সীমায় পৌঁছে পরিণামে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। আর এই হতাশা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পায় অনেক সময়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এভাবে আত্মহত্যা বা আত্মহননের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের চিরবিদায় কখনো প্রত্যাশিত হতে পারে না। কারণ প্রতিটি জীবনেরই মূল্য আছে। প্রতিটি মানুষ সমাজ-সংসারে এবং দেশের উন্নয়নে এগিয়ে যাওয়ার পথযাত্রায় কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন।
আত্মহত্যা বা আত্মহননে মৃত্যুর কথা বলতে গেলে একটি অতি প্রাসঙ্গিক বিষয় বলা দরকার যে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি, অপব্যবাহার প্রভৃতি কারণকে অপঘাতে মৃত্যু কিংবা আত্মহননের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসাবে দেখছেন সমাজ বিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা।
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধৃতি গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য-উত্তাপ্ত একজন বিবেকসম্পন্ন মানুষকে, সমাজ বিশ্লেষক এবং সামাজবিজ্ঞানীকে অবশ্যই ভাবায়। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩১ জনের প্রাণ যাচ্ছে আত্মহননে। বাস্তবে এই সংখ্যা কিছুটা বেশি হতে পারে। এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন ঘটেছে রাজধানীর বাসাবোতে মায়াকাননে। সেখানে একটি বাসায় মা তার গর্ভের প্রিয়কন্যা শিশুকে গলাটিপে হত্যার পর নিজে রশিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। এর আগে গত বছরে বনশ্রীতে মা তার দুই সন্তানকে হত্যা করেন তাদের ভবিষ্যত্ জীবন অনিশ্চিত্ এবং অন্ধকার ভেবে। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। এমনি অবস্থায় সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধন, ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুসরণ-অনুকরণের মাধ্যমেই আত্মঘাতী আত্মহননের প্রবণতা থেকে রোধ হওয়া সম্ভব। সমাজ বিজ্ঞানীদের অভিমতও অনেকটা এ রকমই।
 সারাদেশের থানা, পুলিশ ফাঁড়ির দেয়া তথ্যানুযায়ী বিশেষ করে থানায় লিপিবদ্ধ মামলার তথ্যানুযায়ী দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩১টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ হিসাবে মাসে এ ধরনের অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে ৯০০ জনের। আর বছরে আত্মহননে মৃত্যু ঘটে ১০ হাজার ৮০০ জনের। এসব মৃত্যুকে আত্মহত্যা বা আত্মহনন বলে থানায় প্রদত্ত এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে অনেক সময়  প্রকৃত আত্মহত্যায় বা আত্মহননে মৃত্যুর পরিসংখ্যান জানা সম্ভব হয় না। আত্মহত্যার ক্ষেত্রে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল অপেক্ষা শহরাঞ্চলে বেশি ঘটে। তবে এ ক্ষেত্রেও পরিসংখ্যানে দেশের অন্যান্য জেলা ও বিভাগীয় শহরের তুলনায় রাজধানীতে বেশি ঘটে আত্মহননের ঘটনা। এরপরই রয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল। আবার দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা ও উপজেলাসমূহেও এই প্রবণতা রাজধানীর প্রায় সমসংখ্যক।   
সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে ইদানীং ফেসবুক, ইউটিউব, ইমোসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীসহ মধ্য বয়সীরাও অধিক মাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। এতে বাছবিচার ছাড়া ফেসবুকে দেখা সাক্ষাত্, বন্ধুত্ব, প্রেম-প্রণয়, অতপর বিরহ-বিচ্ছেদের অনেক পরিসমাপ্তি ঘটে আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। আবার কেউ কেউ আপত্তিকর ছবি-বক্তব্য ফেসবুকে আপলোড করে সামাজিকভাবে বিব্রত ও অসম্মান করা হয়। তখন রাগ-ক্ষোভে কিংবা লোকলজ্জা অপমানের হাত থেকে  মুক্তির খোঁজে আত্মহননের দিকে ধাবিত হয়। আবার কখনো কখনো অভাব-অনটন সইতে না পেরে অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
সম্প্রতি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া সন্তানের উদ্দেশে ফেসবুকে একজনের আবেগঘন পোস্ট চোখ ভিজিয়েছে অনেকের। ওইদিন ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন ২০ বছরের চিত্রশিল্পী আফ্রিদা তানজিম মাহি নামে এক মেয়ে। একটি বৃত্তি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সবকিছু ঠিকঠিক ছিল মেয়েটির। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গ্যালারি কলাকেন্দ্রে চলছিল তার প্রথম চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। সবকিছু এত সাজানো গোছানো থাকার পরও মাহির এভাবে চলে যাওয়া মানতে পারছেন না তার মা। কখনও অভিমান, কখনো রাগ আবার কখনো মমতা ভরা পোস্ট লিখে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করছেন তিনি। শুধু মাহি নয়, এভাবে জীবনের মায়া ছেড়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন বিভিন্ন বয়সীরা। কিন্তু এমন মৃত্যুতে ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা। সম্প্রতি সাতক্ষীরার সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোস্তফা লুতফুল্লাহর একমাত্র ছেলে অনিক আজিজ (২৬) নিজেদের ফ্ল্যাটে ইন্টারনেটের তার দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। এরপর ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর সবুজবাগে এক গৃহবধূ পারিবারিক অশান্তির জের ধরে প্রথমে দেড় বছরের মেয়েকে হত্যা করেন, তারপর নিজেও ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রিভেনটিং সুইসাইড  এ বলা হয়,  প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে একটি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে এই সংখ্যা প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজনে পৌঁছবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ৬০ শতাংশ  বেড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক চাপ, হতাশা, অবসাদ ও  হেনস্তার শিকার হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। আবার আর্থ-সামাজিক সমস্যা ও পারিবারিক সঙ্কটের কারণেও অনেকে আত্মহত্যা করে। যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা আত্মহত্যা করেন তাদের তিনজনের মধ্যে একজন মাদকাসক্তের কারণে এই পথ বেছে নেন। আর ৭৫ শতাংশ মাদকাসক্তই আত্মহত্যার চিন্তা করেন।  ২০১৬ সালে দেশে আত্মহত্যা করেন ১০ হাজার ৭৪৯ জন। আর ২০১৭ সালে নভেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ২৫৬ জন। বছর শেষে এই সংখ্যা বেড়েছে। দুই বছরের এই হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জনের বেশি আত্মহত্যা করছেন। এসব আত্মহত্যার বেশিরভাগই ফাঁসিতে ঝুলে। এছাড়া বিষপান ও আগুনে পুড়ে আত্মহননের ঘটনা ঘটছে। কেন এই আত্মহত্যার প্রবণতা? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, আত্মহত্যার অনেক কারণ থাকতে পারে। এর একটি হলো- মানসিক চাপ। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু মানসিক চাপ থাকে। তখন জীবন থেকে পালানো বা আত্মহত্যায় মুক্তি খোঁজে। বিষণ্নতা থেকে এ রকম ঘটনা ঘটে। কারণ জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। এ পর্যায়ে মনে রাখা উচিত সবধরনের সঙ্কট থেকেই বেরিয়ে আসা সম্ভব। আগের মতো সামাজিক বন্ধন এখন নেই। আত্মহত্যা প্রতিরোধে ওই বন্ধন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা জরুরি। আত্মহত্যা রোধে সামাজিক বন্ধন ফিরিয়ে আনাও আবশ্যক। এখন সবাই ঘরমুখী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও জীবনমুখী নয়। ফলে লেখাপড়া শেষে অনেকে বিষয় অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান না। আবার অনেক পরিবার সন্তানের পছন্দ কিংবা মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের পছন্দ তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। এটা মনে রাখা দরকার যে, জীবনের কোনো পরিস্থিতিতে কেউ যাতে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আত্মহননের পথ বেছে না নেয় সেদিকে সবার নজর রাখতে হবে। এই বিনাশী পথ থেকে পরিত্রাণে পরিবারের, সমাজের, রাষ্ট্রের দায় আছে। প্রয়োজন পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক, ধর্মীয় বন্ধন অটুট রাখা।

- সাংবাদিক ও কলামিস্ট


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক : স্বপন কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক: নজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft