৭ কারণে জয়ী জো বাইডেন
বিজয় ভাষণে ঐক্যের ডাক নয়া প্রেসিডেন্ট বাইডেনের
Published : Monday, 9 November, 2020 at 12:56 PM, Count : 553

বর্তমান ডেস্ক: প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রথম ভাষণে জো বাইডেন বলেছেন, তিনি যুক্তরা্েরর আত্মাকে ফিরিয়ে আনতে চান, দেশকে বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ করতে চান। যুক্তরা্েরর স্থানীয় সময় শনিবার রাতে ডেলাওয়ার রাজ্যের উইলমিংটনে নিজের নির্বাচনী প্রচার সদর দপ্তর থেকে দেওয়া ভাষণে বাইডেন বলেন, এখন যুক্তর্রাকে সারিয়ে তোলার সময়।
ভোটের মাঠে তুমুল লড়াই আর অনেক তিক্ততার পর ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্য পেনসিলভেইনিয়ায় জয়ের মধ্য দিয়ে শনিবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের ২৭৩টি ইলেকটোরাল ভোট নিশ্চিত হয়। আর তাতেই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে বাইডেনের হোয়াইট হাউজে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর উইলমিংটনে উৎসবমুখর সমর্থকদের সামনে ভাষণ দিতে এসে বাইডেন বলেন, আমি এমন একজন প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যিনি বিভক্ত নয়, ঐক্যবদ্ধ করার চো করবেন; যিনি লাল রাজ্য বা নীল রাজ্য দেখবেন না, শুধু যুক্তর্রাকে দেখবেন। আমি চেয়েছিলাম আমেরিকার আত্মাকে ফিরিয়ে আনতে, এই জাতির মেরুদণ্ড মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে পুনর্গঠন করতে এবং আমেরিকার প্রতি ফের পুরো বিশ্বের শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনতে, এখানে বাড়িতে আমাদের মধ্যে একতা ফিরিয়ে আনতে। নির্বাচনে যারা তাকে ভোট দেননি তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এখন কর্কশ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর দূরে ঠেলে পেিরাস্থতি স্বাভাবিক করার সময়, আবার একে অপরের দিকে তাকান, ফের একে অপরের কথা শোনেন আর এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা বন্ধ করুন। নবনির্বাচিত এই প্রেসিডেন্ট জানান, জানুয়ারিতে তার অভিষেকের দিন থেকেই যেন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় তা নিশ্চিত করতে তিনি তার করোনাভাইরাস রেসপন্স কমিটি গঠন করে রাখবেন।
কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরা্ের ২ লাখ ৩৭ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়েই এ সংখ্যাটি অনেক বেশি। জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারে এ ভাইরাসের বিস্তার রোধ করার ওপর ব্যাপক জোর দেওয়া হয়েছিল। ৭৭ বছর বয়সী জো বাইডেন এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ডেলাওয়ারের সবচেয়ে বেশি সময়ের সেনেটর তিনি। বাইডেনের জয়ের খবর যখন প্রকাশ হচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তখন ছিলেন ভার্জিনিয়ার স্টার্লিংয়ে গলফ কোর্সে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভোটের হার দেখেই বিজিত প্রার্থী হার স্বীকার করে নেন, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনও তা করেননি, বরং তিনি মামলা করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। ১৯৯০ দশকের পর ট্রাম্পই যুক্তরা্েরর প্রথম প্রেসিডেন্ট, যাকে এক মেয়াদ দায়িত্ব পালন শেষে হোয়াইট হাউজ ছাড়তে হচ্ছে।

৭ কারণে জয়ী জো বাইডেন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। ৫৩৮ ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে এরই মধ্যে ২৯০টি বগলদাবা করেছেন তিনি। আরও দুই-তিনটি রাজ্যের ফল ঘোষণা বাকি। এই জয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস গড়লেন বাইডেন। এর আগেই যুক্তরা্েরর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পাওয়ার ইতিহাসও সৃি করেন ৭৭ বছর বয়সী এ ডেমোক্র্যাট। তিনি পপুলার ভোট পেয়েছেন (ফল ঘোষণা না হওয়া তিন রাজ্য বাদে) ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৭২ হাজার ৫৭০টি। সে পর্যন্ত ট্রাম্প পেয়েছেন ৭ কোটি ছয় লাখ এক হাজার ৯৬৮ ভোট। তবে বিবিসি বলছে, জো বাইডেন মোট পপুলার ভোট পেয়েছেন ৭ কোটি ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৩ ভোট। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ৭ কোটি ৩ লাখ ৩০ হাজার ২১০ ভোট। এতে দেখা যায়, ট্রাম্পের চেয়ে বাইডেন ৪১ লাখ ৪৮ হাজার ৩২৩ ভোট বেশি পেয়েছেন। এখনও ছয় রাজ্যের ভোট গণনা চলছে।
ফল ঘোষণা নিয়ে চার দিন ধরে রুদ্ধশ্বাস সময় কাটছিল মার্কিনিদের। বিশ্বও তাকিয়ে ছিল এর দিকে। ট্রাম্পের নানা অভিযোগ ও তার দল রিপাবলিকানদের নানা কার্যকলাপে বাড়ছিল উত্তেজনাও। অবশেষে সেই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার অবসান ঘটল। ট্রাম্প ফল না মেনে আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরা্েরর ইতিহাসে পর পর দুবার এক ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়ার চল বহুদিনের (দুই-চারোট ব্যতিক্রম বাদে)। তবে এবার সেই রেওয়াজ ভেঙে জো বাইডেন বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তার এই অবিস্মরণীয় জয়ের নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।  বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে সেই কারণগুলো উঠে এসেছে।

করোনাভাইরাস: ট্রাম্পের পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে– বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসকে। কোভিড ১৯-এ দেশটিতে আজ পর্যন্ত ২ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এক কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত। এই মহামারীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে বলে মার্কিনিরা মনে করেন। এমনকি ট্রাম্প এই ভাইরাসকে শুরু থেকেই গুরুত্বই দেননি। তিনি এটিকে সাধারণ ফ্লু হিসেবে আখ্যা দেন। এমনকি উইসকনসিনে নির্বাচনী র‌্যলিতে কোভিড-১৯ সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন ফেক নিউজে সব কিছুই কোভিড, কোভিড, কোভিড, কোভিড। মহামারী সম্পর্কে তার যে অবস্থান, যেভাবে তিনি বিষয়টি সামলেছেন সেটি শেষ পর্যন্ত তার বিপক্ষেই গেছে। অন্যদিকে জো বাইডেন ক্যাম্প কোভিড ইস্যুতে যে অবস্থান নিয়েছিলেন সেটি তাকে এগিয়ে দিচ্ছে এমনটিই দেখা গিয়েছিল গত মাসে করা এক জনমত জরিপে।

ট্রাম্পের ভুল প্রচার: বৈশ্বিক মহামারীতে যে ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা কৌশলকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
মহামারী ও ফলে সৃ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়শই যেভাবে লক্ষ্যচ্যুত হয়েছেন, বিজ্ঞানকে প্রশ্ন করেছেন, একদম হুট করে এলোমেলোভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পক্ষপাতমূলক আচরণ এই বিষয়গুলো জো বাইডেন ক্যাম্প সফলভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপক্ষে কাজে লাগিয়েছে।

বাইডেনের ধীরগতির প্রচার: বাইডেনের চতুন প্রচার কৌশলই তাকে নির্বাচনে এগিয়ে দিয়েছে। এর আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন তার দীর্ঘদিনের রাজনীতিতে ভুল বক্তব্য ও অসমীচীন কাজের জন্য বিশেষ পেরাচতি পেয়েছিলেন।
যেসব ভুল তাকে প্রায়শই বিপদগ্রস্ত করেছে। আগের তিনটি নির্বাচনে ভুল প্রচার কৌশলে ধরাশায়ী হন বাইডেন। ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে এমন ভুল তার হারের কারণ ছিল। জো বাইডেন তার ভুল বক্তব্যের জন্য বিশেষ পেিরাচতি পেয়েছিলেন। ২০০৭ সালে আবার যখন তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন সেবার তার তেমন একটা সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু তৃতীয়বার যখন ওভাল অফিসের জন্য লড়েছেন, তখন তিনি বক্তব্য দেয়ার সময় যথে কম হোঁচট খেয়েছেন। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে– ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে তার লাগামহীন অসামঞ্জস্যপূর্ণ নানা বক্তব্যের কারণে নিয়মিত খবরের উৎস ছিলেন। আর তা ছাড়া বৈশ্বিক মহামারী, অর্থনৈতিক সংকট, জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময়ের সহিংস বিক্ষোভু এ রকম জাতীয় পর্যায়ের বড় ঘটনার দিকে সমাজের মানুষের মনোযোগ বেশি ছিল। এর বাইরে এবার বাইডেন ক্যাম্প খুব হিসাব কষে এগিয়েছে। বাইডেনকে যতটা সম্ভব কম জনসম্মুখে আসতে দেখা গেছে।
আর যেই হোক ট্রাম্প নয়: নির্বাচনের দিনটির এক সপ্তাহ আগে জো বাইডেন ক্যাম্প তাদের সর্বশেষ টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রচার করে। গত বছর জো বাইডেন প্রার্থী হিসেবে যখন মনোনীত হন এবং যেদিন তার প্রচার শুরু করেন সেই সময়কার বক্তব্যের সঙ্গে এই বিজ্ঞাপনের বক্তব্যে বেশ লক্ষণীয় সাদৃশ্য ছিল। লাগামহীন অসামঞ্জস্যপূর্ণ নানা বক্তব্যের কারণে নিয়মিত খবরের উৎস ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই নির্বাচনকে উল্লেখ করা হয় যুক্তরা্েরর আত্মরক্ষার যুদ্ধ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরকে বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলার সময়কাল বলে উল্লেখ করা হয়। মার্কিনিরা শান্ত ও অবিচল একজন নেতা চেয়েছেন। ভোটারদের অনেকেই বলেছেন, তারা ব্যক্তি হিসেবে ট্রাম্পের আচরণে রীতিমতো বীতশ্রদ্ধ। বাইডেন ক্যাম্প ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে, এই নির্বাচন যেন দুই প্রার্থীর মধ্যে যোগ্য একজনকে বেছে নেয়ার নির্বাচন নয়।
মধ্যপন্থী অবস্থান: ডেমোক্র্যাট দল থেকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ার লড়াইয়ে জো বাইডেনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি বামপন্থী হিসেবে পেিরাচত। আরেকজন ছিলেন এলিজাবেথ ওয়ারেন। যার ক্যাম্পেইনে বেশ ভালো অর্থের জোগান ছিল। এই দুজনের যে কোনো সভায় রক গানের কনসার্টের মতো মানুষ জড়ো হতো। কিন্তু জো বাইডেন উদারপন্থীদের চাপের মুখেও মধ্যপন্থী অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, বিনামূল্যে কলেজ শিক্ষা ও ধনীদের জন্য বেশি করারোপ করার নীতিগুলোতে সমর্থন দেননি। ফলে তিনি মধ্যপন্থী ও অসন্তু রিপাবলিকানদের কাছে টানতে পেরেছেন। কমলা হ্যারিসকে রানিং মেট হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে এটি প্রকাশ পেয়েছে।



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক: এ. কে. এম জায়েদ হোসেন খান, নির্বাহী সম্পাদক: নাজমূল হক সরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Developed & Maintainance by i2soft