নদী রক্ষায় আমাদের করণীয়
Published : Monday, 18 September, 2017 at 9:18 PM, Count : 168
নদী রক্ষায় আমাদের করণীয়মো. আলতাফ হোসেন : বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। এর কারণ হলো ছোট এই দেশের মধ্যে দিয়ে ছোট বড় সাতশর মতো নদী বয়ে গেছে। এ দেশের মানুষের পেশা, জীবনযাপন এবং সাহিত্য সংস্কৃতি সবকিছুই যে নদীর উপর সরাসরি নির্ভরশীল। নদী যে অঞ্চলে উত্পত্তি লাভ করে তাকে নদীর উত্স এবং যে স্থানে সমুদ্রে বা হ্রদে মিলিত হয় সেই স্থানকে মোহনা বলে।
‘পৃথিবীর তিনভাগ জল আর এক ভাগ স্থল’- এ সত্য জেনে আমরা বেড়ে ওঠেছি। প্রায় ১৫ ভাগ ব্যতীত পৃথিবীর জনসংখ্যার বাকী অংশ শুষ্ক অঞ্চলে বাস করে। এই প্রকৃতি কেবল আমাদেরই নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম ও এর সমান দাবিদার। বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বাস করে শহর এলাকায় এবং দিন দিন এ সংখ্যা বাড়ছেই। যদিও শহর এলাকায় গ্রামের চেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা রয়েছে, তারপর ও বর্ধিত জনসংখ্যা নিয়ে শহরগুলো সংগ্রাম করছে নিরন্তর।
নদীর ধারে যে জমি সেই জমি চাষ করা হতো নদীর পানিতে। ফলানো ফসল শহরে নিয়ে যাওয়া হতো নদী পথে। নদী আমাদের সমাজ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জাতীয় জীবন অর্থনীতির চালিকা শক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম যা কিনা অন্যান্য উপাদান গুলোর সাথে খুবই নিরিড়ভাবে সম্পৃক্ত। নদীর গুরুত্ব বোঝাটা তাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রত্যাশিত বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা বাড়বে ৫০ শতাংশ, যা ২০৫০ সালে হবে ৭০ শতাংশ, যেখানে হাইড্রো পাওয়ার এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদসহ মোট জ্বালানি চাহিদা বাড়বে ৬০ ভাগ। বর্ধিত কৃষি উত্পাদনের জন্য বিপুলভাবে পানি ও জ্বালানি চাহিদা উভয়ই পানি ব্যবহূত ক্ষেত্রগুলোয় প্রতিযোগিতা বাড়বে। এসব বিষয় গভীরভাবে সংযুক্ত।
ঐতিহাসিকভাবে নদীর সঙ্গে মানবসভ্যতার সম্পর্কটা পরিপূরক। যেখানে নদী নেই সেখানে সভ্যতা নেই। যেখানে নদী মারা গেছে সেখানে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে। মিশরীয় সভ্যতাকে নীল নদের দান বলা হয় নীল নদের ধারে সেচের মাধ্যমে কৃষি কাজ আর নৌযানে যোগাযোগের সুবিধার কারণেই একদল মানুষ সেই পাঁচ হাজার বছর আগে সেখানে সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। সিন্দু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্দু নদের তীরে। হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারো শহর দুটোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সাথে সিন্দু নদের সম্পর্ক ছিলো অবিচ্ছিন্ন। আমরা যে মেসোপটে মিয়া সভ্যতার কথা বলি সেই ‘মেসোপটে মিয়া’ শব্দটির অর্থ হলো ‘দুই নদীর মধ্যবর্তী স্থান’। অর্থাত্ টাই গ্রিস এবং ইউ ফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী স্থানে গড়ে ওঠেছিল এই সভ্যতা। সুতরাং নদীই সভ্যতার জননী।
আধুনিক সভ্যতাসমূহ নদীর ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল। এ কারণে নদীগুলোর ব্যবহার এখন বহুমাতৃক। মানুষ বুঝে না বুঝে নদীকে ব্যবহার করছে। নদীর ধারে গড়ে ওঠেছে বড় বড় কলকারখানা, নদীতে এখন হাজার হাজার লঞ্চ স্টিমার। নদীতে শত শত বাধ। যখন যেভাবে প্রয়োজন তখন সেভাবে নদীকে ব্যবহার করা হচ্ছে। উজানের দেশ পানি প্রত্যাহার করছে স্রোতহীণ নদী ভরাট করে দখল করার মহোেব মেতে ওঠেছে ভূমিদস্যুরা। এই সব বহুমাত্রিক ব্যবহার কখনো নদীর জীবনের জন্য হয়ে ওঠছে বিপজ্জনক। নদী দূষণ আর নদী ভরাট বাংলাদেশের অনেক নদীকে মেরে ফেলেছে ধীরে ধীরে। সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করলেও নানাবিধ কারণে সেসব নদীকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। এটা কেবল সরকারের একার পক্ষে করাটা সম্ভব না। এ জন্য সবাইকে বুঝতে হবে, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সবার প্রচেষ্টায় নদীকে বাঁচাতে হবে। সে জন্য প্রথমে দরকার একটি সম্মিলিত বোধ।
এখন প্রায় ৭৮ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি পায় না। আর আড়াইশ’ কোটি মানুষের পর্যাপ্ত পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। ৬০-৮০ লাখ বাহিত অসুখে মারা যায়। গড়ে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার মানুষের বর্তমান জীবন ধারা বজায় রাখতে হলে পৃথিবীর মানুষের এমন ৩ দশমিক হলে পৃথিবীর প্রয়োজন হবে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির সহজ সভ্যতা কমছে দিন দিন। যদিও বিশ্বে ভবিষ্যতে শুধু কৃষি কাজে ব্যবহূত পানির পরিমাণ আনুমানিক ২০৫০ সাল নাগাদ ১৯ শতাংশ বাড়বে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিংবা নীতিগত মধ্যস্থতা না হলে এটা আরো বাড়তে পারে।
২০১২ সালের ৬ মার্চ বিশ্বে স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের জয়েন্ট মনিটরিং রিপোর্টে বলা হয়েছে। এমডিজি সেভেনে সুপেয় পানির যে লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বৈশ্বিকভাবে অর্জন হয়েছে। বাংলাদেশ ও লক্ষমাত্রা অর্জনে সঠিক পথে এগোচ্ছে। খাদ্য উত্পাদনে পানির ব্যবহার সুপেয় পানি সম্পদ অপচয়ের বড় খাত। এক কেজি ধান উত্পাদনে ৩ হাজার ৫০০ লিটার পানি প্রয়োজন হয়। আর এক কেজি গরুর মাংস উত্পাদনে পানির প্রয়োজন ১৫ হাজার লিটার। এ ক্যালরিনির্ভর খাদ্যোভাসের পরিবর্তন গত আধা শতকে পানি ব্যবহারে প্রভাব ফেলেছে। আশষ্কা যে, এটি একুশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত জারি থাকতে পাবে।
নদীমাতৃক দেশ হিসেবে আমাদের পরিবেশ অর্থনীতি, যোগাযোগ উন্নয়ন বলতে গেলে সবকিছুই নদী নির্ভর আর এদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শত শত নদীর প্রায় সবই কোনো না কোনো ভাব ৫৭ টি আন্তসীমান্ত নদীর ওপর নির্ভরশীল। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের নির্ভর করতে হয় উজান দেশের ওপর। কারণ এ সব আন্তঃসীমান্ত নদীর উত্স বাংলাদেশের বাইরে সেখানে যে কোনো ধরনের স্থাপনা প্রকল্প কিংবা ইন্টারভেনশন আমাদের দেশের নদীগুলোর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভাটির দেশ হিসেবে যে কারণে আমরা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব সময় নদীভিত্তিক সহযোগিতার কথা বলে আসছে। নদী বা পানিবিষয়ক সেথা চুক্তি, কনভেনশন কিংবা প্রটোকল রয়েছে। বাংলাদেশের সব সময় দেশগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের পক্ষে। আমরা চাই এ অঞ্চলে পানিভিত্তিক বৃহত্তর সহযোগিতার ক্ষেত্র গড়ে উঠুক। বাংলাদেশের উচিত পানিভিত্তিক কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক এই আবহ কাজে লাগানো। বাংলাদেশ ও ভরতের যৌথভাবে কর্মসূচি গ্রণে করা উচিত। কারণ টেকসই উন্নয়নে নদীগুলোর ভূমিকা অনেক। পানিভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুই দেশের সদিচ্ছা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছি আমরা। তিস্তার পানি বণ্টন কিন্তু কোনো চুক্তিতে উপনীত হতে পারছি না। 
এভাবে ৫৪টি নদী নিয়ে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠতে হলে বহু বছর লেগে যাবে। মনে রাখা উচিত নদী মানে কিন্তু পানি নয়। এর প্রতিবেশ জীববৈচিত্র্য নিয়ে ভাবতে হবে। নদীর প্রতিবেশ ও প্রবহমান তা অক্ষতু্ন রাখতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রবাহ রাখতে হবে। আর নদীর নানা ধরণের ব্যবহার রয়েছে। নৌচলাচল, সেচ, সুপেয় পানির আধার প্রভূতিকারণে নদী গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য অববাহিক ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। যাতে নদীর সুফল নদীকূলবর্তী দেশের সব মানুষই পায়। তাহলে পানি বন্টন নিয়ে জটিলতা অনেকাংশে এড়ানো যাবে।
উত্তরাঞ্চলে মরু ময়তার কারণে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ দিয়েও পানি উঠছে না। ফলে বোরো ধান নির্ভর বাংলাদেশের ধান চাষে বিপর্যয় নেয়ে আসার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের দেশের উত্তরে পানি সঙ্কটে মরুময়তার অশনিসঙ্কেত দক্ষিণে ধেয়ে আসা লবণান্ততার তীব্র ছোবল, ভূ-গঠস্থ পানি প্রাপ্যতার অপ্রতুলতা ও আর্সেনিক দূষণ, ভূ-উপরিস্থ পানিতে অবাধে কৃষি আর শিল্প রাসায়নিক ও মনুষ্য বর্জ্য ফেলা, মানুষের বসতি চাপ ও শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডে দূষনীয় পদার্থের আধিক্য প্রকৃতি কারণে নিরাপদ পানির ক্ষেত্রে আমরা ঝুঁকির মধ্যে আছি। সমুদ্র পৃষ্ঠের উষ্ণতা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে ততোই বাড়ছে ঘূর্ণিঝড় ও জলচ্ছ্বাসের প্রকোপ। উরাঞ্চলে মরুময়তার কারণে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে।
নদীর উপকারভোগী আমরা সবাই তবে সরাসরি কিছু অংশীজন রয়েছে যারা একই ভাবে নদীকে শোষন করছেন বেশি। যেমন কিছু ফ্যাক্টরি বা কারখানা, হাসপাতাল, লঞ্চ স্টিমার ব্যবসায়ী। দখলদারগোষ্ঠী এবং উজানে পানি প্রত্যাহার ও বাঁধ নির্মাণ। শুধু বুড়িগঙ্গাই নয় দূষিত হয়ে বিষাক্ত নালায় পরিণত হয়েছে বড় বড় শহরের ধার ঘেসে চলা সব নদীই। এভাবে চলতে থাকলে কিছু দিন পর নদীগুলোতে আর মাছ পাওয়া যাবে না। পানি কৃষি কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাবে। আর একই সাথে ছড়াবে নানা রকমের অসুখ-বিসুখ। নদী দূষণের ফলে ইতোমধ্যে মাছের শরীরে নানা রকম অসুখ দেখা দিয়েছে যা আমাদের মানব শরীরের জন্যও ক্ষতিকর। পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে দিন দিন। সুতরাং নদীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত হিসেবে ভাবাব কোনো সুযোগ নেই। নদী অসীম নয় এর ও নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা রয়েছে, যা খুশি নদীতে ফেলে দিলে নদী সেটা শোষণ করে নেবে এমনটা ভাবা ভুল। আর দশটা পার্থিব অস্তিত্বের মতো নদীও পার্থিব উপাদান। তারও যত্ন এবং ভালোবাসার দরকার রয়েছে।
দেশে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে নদী দখল দূষণ বন্ধ করতে হবে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, লোভ-ক্ষোভ আর মুনাফালোভীদের কারণে দেশের নদ নদীগুলো ধ্বংসের মুখে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কাছে নদী তার চির চেনা রূপ হারাতে বসেছে। নদীতে সব সময় এক রকম পানি থাকে না এটা ঠিক। কিন্তু ন্যূনতম একটি পানির স্তর থাকে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এর বাধা গ্রস্ত হয়। নদীর পানির ধারা কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে বিভিন্ন ভাবে সমাজে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। নদীর নাব্য হারানোর বিষয়টি পুরোপরি আমাদের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু পরোক্ষভাবে আমাদের অসচেতনতা এর জন্য অবশ্যই দায়ী। বাংলাদেশের সাথে প্রতিবেশী দেশের আন্তঃনদী মোট ৫৭টি। এর মধ্যে ৫৪টি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশ হলো ভাটির দেশ। 
ভারত উজানের দেশে, বড় দেশ এবং প্রভাবশালী দেশ হওয়ায় অনেক সময়ই তারা নদীর স্বাভাবিক গতি পথকে প্রভাবিত করে থাকে। নদীতে বাধ দিয়ে পানি সরিয়ে নেয় বা বিদ্যুত্ উত্পাদনের কাজে ব্যবহার করে। যে সময় তাদের কৃষি জমিতে পানি চাহিদা বেড়ে যায়া তারা পানি নদীগুলোর বাংলাদেশের অংশ রয়ে যায় তৃষ্ণার্ত শুষ্ক। এ সময় আমাদের দেশেও কৃষি কাজ চলতে থাকে কিন্তু পানির অভাব। মাটির নিচের পানি তুলতে তুলতে আমরা পানির স্তর ও নিচে নামিয়ে দেই। 
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় বেশির ভাগ নদীতেই আর সারা বছর নাব্যতা থাকে না। পদ্মা নদীর বুকে প্রায় সারা বছর বড় বড় চর দেখা যায়। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে বিশাল ধুধু মাঠ। সেখানেই গড়ে ওঠেছে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র। পদ্মার পানি পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের রিঅ্যাক্টর শীতলীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। অন্তত এ কারণেই ওই জায়খাটিতে বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন করার জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। কিন্তু নদীর নাব্য আমরা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে সামনে অবধারিত বিপদ। হাজার কোটি টাকা খরচ করে যমুনা সেতু তৈরি করা হয়েছে। এই যমুনা বা স্বাভাবিক নাব্য নেই। যমুনা সেতুর উপর থেকে তাকালে দেখা যায় বিস্তৃত চর। আবার হুট করেই দেখা যায় পানির আধিক্য তখন সিরাজগঞ্জ শহরে নদী ভাঙ্গনে নেয় দানবীয় আকার। নদীর এই রকম কৃত্রিম প্রবাহ আমাদের সমাজ জীবনকে বিপন্ন করতে পারে।
সবচেয়ে করুণ অবস্থা তিস্তা নদীর। তিস্তা নদীতে পানি নেই। উত্তরবঙ্গের প্রায় সবগুলো জেলা তিস্তা নদীর উপর নির্ভরশীল। ইছামতী নদী এক সময় পাবনা নাটোরের সৌন্দর্য ছিল। এখন এটাকে একটা নর্দমা বলে মনে হয়। পঞ্চগড় জেলায় নদী থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর আর বালি তুলতে গিয়ে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে ডাহুক আর চাওয়াই নদী। এলোমেলো খালের সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে পরিবর্তিত হচ্ছে নদীর গতিপথ।
টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এ অবস্থায় প্রধান করণীয় হচ্ছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার মতো নতুন কৌশল উদ্ভাবন এবং সেগুলো প্রয়োগ করা। নদী দূষণ ও অনাব্য কমাতে পারলেই নদী সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যাগুলো হয়তে ধীরে ধীরে কমে আসবে। কিছু এই প্রধান দুই সমস্যা সমাধান দুটো করা আগে প্রয়োজন। মানুষের দুর্ভোগ ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া লবনাক্ত পানির প্রকোপ থেকে ফসলি জমি যতটুকু পারা যায় রক্ষা করা, খরা, নদী ভাঙন ইত্যাদি দুর্যোগে অধিক সংখ্যায় মানুষ যাতে বাস্তচ্যুত না হয়, এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া, নোনা পানি সহনশীল কৃষি পদ্ধতিতে উদ্ভাবন করা। এসব ব্যাপারে বিশ্ব বিদ্যালয় ও গবেষণা সংস্থাগুলোকে বাস্তবসম্মত ধ্যান ধারণা নিয়ে কাজ করতে হবে এবং তাদের এ গবেষণায় সরকারকে সবরকম সহযোগিতা দিতে হবে। এ জন্য গবেষণা খাতে বরাদ্ধ বাড়াতে হবে। 
প্রতিটি জেলায় নদী রক্ষা কমিটি নামে একটি কমিটি রয়েছে যার সভাপতি হলেন জেলার সম্মানিত জেলা প্রশাসক। নদী ভরাট ও অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সকলকে নিয়ে কাজ করা, নদী খননের প্রশাসনিক কার্যাদি সম্পাদন ও নদী রক্ষায় নানা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি মুলক কাজ করে এই কমিটি। কিন্তু শুধু জেলা প্রশাসন অথবা পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী বাঁচাতে পারবে না। এ জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি সরকারকে আশু মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পগুলোর কাজের গতি যেমন ত্বরান্বিত করতে হবে। তেমনি এসব কাজের জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন কলকারখানার মালিক শ্রমিকদের সমিতির সঙ্গে নিয়মিত এ ব্যাপারে বৈঠক করতে হবে। চামড়া বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে এই আন্দোলনের কমিটি স্থাপন করে দিয়ে আইনগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা যেতে পারে। যাদের কারণে নদী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের তালিকা তৈরি করে আরোপ করা যেতে পারে নানা রকম দণ্ড। প্রয়োজনে নদী রক্ষার জন্য দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দিতে হবে প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবিকে। তারা নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। 
নদীর জমি সিএস ম্যাপ অনুযায়ী খাস জমি হিসেবে বহাল রাখতে হবে। নদী দূষণ রক্ষার্থে বেশি বেশি শিল্প বর্জ্য শোধনাগার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাগার তৈরি করতে হবে। নদী দখল রোধ করতে ভূমি দপ্তরের কর্মকর্তাদের হতে হবে আরো সচেতন। নদীর জমি ভরাট করে ব্যক্তিগত মালিকানায় স্থানান্তরের কোনো সুযোগ নেই।
নদী নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে আমাদের দেশ এখন আধুনিকারণের মহাসড়কে রয়েছে। এই আধূনিকারণ যদি প্রকৃতি এই অবিচ্ছিন্ন উপাদানকে দূষিত করে। কলুষিত করে তবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত টেকসই উন্নয়ন কখনোই অর্জন করা সম্ভব হবে না। 
টেকসই উন্নয়নের জন্য যে অর্থনীতি আমাদের প্রয়োজন সেই অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে নদীকে তার হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে হবে। নদী আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আর্থ সামাজিক জীবনের উন্নয়ন অর্থহীন হবে যদি মাবনজীবন বিপন্ন হয়। এজন নদী রাক্ষাকে সবার আগে বিবেচনা করে সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। দেশের নদী ও পরিবেশ রক্ষায় যথেষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু তার সার্বিক প্রয়োগের অভাবে দেশের অধিকাংশ নদ-নদী হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশের নদী রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে নদীর কথা শুধু পাঠ্য বইতেই পাওয়া যাবে। টেকসই উন্নয়ন ও নদী রক্ষায় পরিবর্তন করতে হবে। আমরা শিল্প কারখানার উন্নয়নের কথা ভাবি। কিন্তু এর বর্জ্য আমাদের কী পরিমাণ ক্ষতি করে তা নিয়ে খুব বেশি ভাবি না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান, উপদেষ্টা সম্পাদক: স্বপন কুমার সাহা।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মুন গ্রুপ, লেভেল-১৭, সানমুন স্টার টাওয়ার ৩৭ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।, ফোন: ০২-৯৫৮৪১২৪-৫, ফ্যাক্স: ৯৫৮৪১২৩
ওয়েবসাইট : www.dailybartoman.com ই-মেইল : news.bartoman@gmail.com, bartamandhaka@gmail.com
Developed & Maintainance by i2soft